(কিছুটা ফ্ল্যাটল্যান্ড অবলম্বনে)
জেনারেল রিলেটিভিটি অনুযায়ী মহাকর্ষ আসলে স্পেস টাইমের বক্রতা, সেটা কোনভাবে বেঁকে আছে। মহাকর্ষের কথায় অনেক পরে আসবো, স্পেসের সাথে টাইম কিভাবে মেলে সেই আলোচনাও সামনের জন্য থাকলো। আপাতত আজকে দেখে আসি বক্রতা কি জিনিস। কোন কিছু কি সত্যি সত্যি বাঁকে? আসলেই কি স্পেস বেঁকে আছে?
আজকের আলোচনা একেবারেই প্রাইমারি লেভেলের, আর আপাতত আমরা সময় ভুলে শুধু স্পেস নিয়ে ভাববো। আর একটা কথা, এই সিরিজের প্রতিটা পর্বই তুমি সম্বোধনে প্রকাশিত হবে, কারও সমস্যা থাকলে ইগনোর করো/করেন।
১।
এক যে ছিল 2D জগত।
সেই জগতে বাস করতো চ্যাপ্টা প্রাণীরা।
একবারে চ্যাপ্টা।
তাদের দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ আছে, উচ্চতা নেই বললেই চলে। থাকলেও তাদের ব্রেইন উচ্চতা জিনিসটা বুঝে না, বুঝলেও চিন্তা করে না – অনেকটা বাঙালিদের মতো আরকি।
তারা খাওয়া দাওয়া করতো, ঘুরে বেড়াতো, প্রেম ভালবাসা করতো, মারাও যেত। কোনদিন উপর নিচের চিন্তা না করে।
ওই জগতে দুই চারজন বিজ্ঞানী ছিল না যে সেটা না। এইতো টুডিন্সটাইন নামে এক পাতি বিজ্ঞানীর কিছুদিন নানান ধরণের আজগুবি জিনিস বলার চেষ্টা করলো, জনগণ ধরে তাকে টুবিসিএস পরীক্ষা দিতে লাগিয়ে দিলো। টুডিন্সটাইন দুই দিনে ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
2D জগতের প্রাণীরা যেহেতু উপর নিচ বুঝত না, তাদের চলা ফেরা সবসময় ছিল সামনে পেছনে নাতো ডানে বামে। ডান বামের জ্ঞান তাদের বেশ ভালভাবে ছিল। কাকরাইল থেকে শান্তিনগর পর্যন্ত সোজা আসতে লাগে ১০ মিনিট, আর যদি মৎস্যভবন, বেইলি রোড ঘুরে হেলতে দুলতে কাকরাইল থেকে শান্তিনগর আশা হয় তাহলে লাগে ১ ঘণ্টা, এইটুকু জিনিস একটা দশ বছরের বাচ্চাও বুঝত, এটা বুঝার জন্য টুডিন্সটাইন হওয়া লাগে না।
ঝামেলা হলো, কিছুদিন আগে শহরের পাশে জঙ্গলের মধ্যে একটা আজব রাস্তা আবিষ্কৃত হওয়ার পরপর। ছোট্ট একটা রাস্তা, বাইরে থেকে দেখতে মনে হয় মাত্র এক কিলোমিটার, কিন্তু কেউ ওই রাস্তা দুই ঘণ্টার কমে হেঁটে পার করতে পারে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, রাস্তার ঠিক পাশ দিয়েই তুমি হেঁটে ১০ মিনিটে এক কিলো পারি দিতে পারবে। কিন্তু রাস্তায় উঠলেই তোমার খবর হয়ে যাবে। বাইরের মানুষ বলবে তুমি খুব ধীরে হাঁটছ। যে বাসটা ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে সেটাও খুব ধীরে চলছে। শুধু তাই না, বাসের ভেতরের মানুষ গুলোও ধীরে ধীরে নড়ছে। ঠিক যেন ওই রাস্তায় সময় ধীর হয়ে গেছে। শুধু তাই না, বাসগুলো সব কেমন জানি লম্বায়ও ছোট গেছে!
রাস্তার যাত্রীরা এসব টের পাবে না। তাদের কাছে, রাস্তাটা কেমন জানি লম্বা হয়ে গেছে। শুধু মনে হলো না, একজন রাস্তার দৈর্ঘ্যও মেপে ফেলল। রুলার দিয়ে একটু একটু করে পুরা রাস্তা মাপা শেষ করলো। রাস্তার দৈর্ঘ্য আসলো ১০ কিলোমিটার, যদিও রাস্তার পাশের মাটির রাসাটা মাত্র ১ কিলোমিটার লম্বা। (2D ল্যান্ডে ওরা এভাবেই রাস্তা মাপে, রুলার দিয়ে দিয়ে। সেদেশে টুডিন্সটাইনকে বিসিএস দিতে পাঠানো হয়। )
কিন্তু লম্বা তো হয় রাস্তা বাঁকলে। এই রাস্তা একেবারে সোজা চলেছে, কোন বাকাবাকি নাই। রাস্তা লম্বা হলো কিভাবে?
ডাক পড়লো টুডিন্সটাইনের। আঁকাবাঁকাবাইজানের রাজধানীর নাম মুখস্ত করতে করতে তখন তার ঝাঁকড়া চুলের মাথা টাকলা হওয়া শুরু করেছিলো।
টুডিন্সটাইন আসলো। কিছুক্ষণ চিন্তা করলো। তারপর বলল, রাস্তা মনে হয় আসলে বেঁকেছে।
কোন দিকে বেঁকেছে?
আমি তোমাদের অনেকদিন আগের থেকে আরেকটা ডাইমেনশনের কথা বলছিলাম না? ওই যে উপর নিচ? ওই দিকে বেঁকেছে। আমরা ডান বামের বাইরে কিছু বুঝি না জন্য বুঝতে পারছি না। রাস্তার মাঝখানে একটা পাহাড় নাতো গর্ত আছে। ওইটার উপর দিয়ে যেয়ে রাস্তা লম্বা হয়ে গেছে।
ওও, পাহাড় আছে না গর্ত?
একটা থাকলেই হলো। রাস্তা বেঁকেছে, এইটাই হচ্ছে আসল কথা।
এই থিওরি লোকজনের পছন্দ হলো না। পাশের বাড়ির ফিটফাট বয় টুডিটেস্লা নাক সিটকে বলল, যত্তসব গাঞ্জা, এইসব ফালতু থিওরি টুডিসনও দিতে পারে। মনের দুঃখে
টুডিন্সটাইন টুবিসিএসে মন দিলো।

২।
সত্যি সত্যি কি রাস্তা বেঁকেছে? উপর নিচ বলে কি আসলেই কিছু আছে?
টুডির লোকেরা জানে না।
আমাদের জগতে আইনস্টাইনকে বিসিএস দিতে হয় নি। তিনি তাঁর থিওরিটা শেষ করতে পেরেছেন।
এই থিওরি মতে, রাস্তা বেঁকেছে ধরে নিলে হিসাব মেলে কিভাবে এক কিলো রাস্তা ১০ কিলো হয়ে গেল।
রাস্তা কোন দিকে বেঁকেছে ব্যাপার না। 2D জগতের মানুষরা সেটা চিন্তাও করতে পারবে না।
তারা শুধু পারবে রাস্তার উপরে হেঁটে হেঁটে রাস্তার দৈর্ঘ্য মাপতে।
রাস্তা লম্বা হয়েছে, তার মানে রাস্তা বেঁকেছে।
এই জিনিসের ছবি আঁকা হয় কখনো গভীর গর্ত দিয়ে, কখনো পাহাড় দিয়ে। আমি পার্সোনালি গর্তই আঁকতাম, ঢাকার রাস্তায় অনেক গর্ত চোখে পড়ে, কোনটার গভীরতা ১০ কিলোমিটার হওয়াও অসম্ভব না।
৩।
এটা তো বুঝলাম রাস্তা লম্বা হওয়া। রাস্তা ছোট হয় কিভাবে?
এটা চিন্তা করার অনেক উপায় আছে।
ধরেন 2D জগতের লোকেরা অলরেডি একটা পাহাড়ে আছে। নিচু পাহাড়।
নিচু পাহাড়ে থেকে অভ্যাস, ওরা যখন এভারেস্টে চড়ে, বলে রাস্তাটা অনেক বেশি বেঁকেছে।
আর যখন পাহাড়ের সুড়ঙ্গ পথে বের হয়, ওদের রাস্তাটা উলটা দিকে বেঁকেছে।
রাস্তাটা সোজা হয়ে গেছে।
ওই সুরঙ্গ দিয়ে গেলে এক ঘণ্টার পথ দশ মিনিটে যাওয়া যায়।
৪।
আমরা 4D জগতের প্রাণী।
আমাদের রাস্তা বাঁকতে হলে পাঁচ নাম্বার ডাইমেনশন লাগবে।
আমরা বের হয়ে দেখতে পাচ্ছি না রাস্তা আসলে কোন দিকে বেঁকেছে।
আসলেই রাস্তা বেঁকেছে নাকি শুধু হিসাবের জন্য, তাও আমরা জানি না।
আনরা জানি, রাস্তা লম্বা হয়েছে মানে রাস্তা বেঁকেছে।
এই বক্রতার নান ইন্ট্রিন্সিক বক্রতা। ভেতর থেকে মাপতে হয়।
ক্লিয়ার?
আগামী পর্বে আসবে রিম্যানের জ্যামিতি।
(চলবে)
ojaer Hasan Khusbu
4D ডাইমেনশন কি সময় সহ ধরা হয়। আর মনে করেন আমরা ৫ মাত্রার জগৎ খুঁজে পেলাম। তাহলে কি সেই জগত দিয়ে ৪র্থ মাত্রা মানে সময়ের সম্প্রপ্রসারণ/সংকোচন ঘটবে।
Dipu Alnur
দারুন দাদা
Nayem
অসাধারণ করে বুঝিয়েছেন ভাই😍