১.
জসীমের বাড়ির কাছ থেকে মাত্র দশ মিটার দূরে থানকুনি পাতার বাগান। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে থানকুনি পাতা আনতে যায়।
ঝামেলা হচ্ছে, বাড়ির সামনে আছে একটা পাহাড়। জসীম কষ্ট করে প্রতিদিন ওই পাহাড়ে উঠে, আবার নামে। এতে করে দশ মিটারের পথ একশো মিটার হয়ে যায়। পথের দৈর্ঘ্য দশ গুণ বেড়ে যায়। জসিম তবুও পাহাড় পার হয়ে হেঁটে যায়। মহামূল্য থানকুনি পাতার জন্য এটুকু কষ্ট করাই যায়।
আমরা যদি বাসা আর থানকুনি পাতার সরাসরি দূরত্ব ধরি dx, জসীমের অতিক্রান্ত পথ ধরি ds, তাহলে আমরা পাই,
ds = 10dx
ds^2 = 100 dx^2

২.
পীথাগোরাসের সূত্র মেনে, দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রে কোন দুইটা বিন্দুর দূরত্ব মাপার সূত্র হচ্ছে
ds^2 = dx^2 + dy^2.
এই সূত্র কাজ করবে সমতল কাগজ হলে। যেমন ধরো, আক্কাস আলীর বাসা আর থানকুনি পাতার বাগানের মধ্যেও একটা পাহাড় ছিল। তিনি ক্রেন দিয়ে মাড়ি সরিয়ে পাহাড় পর্বত সব সমতল করে ফেলেছেন। এখন সুন্দরমত পীথাগোরাসের সূত্র ব্যবহার করে বাসা আর থানকুনি পাতার দূরত্ব মাপতে পারেন।
আক্কাস আলীর বাসার স্থানাঙ্ক যদি হয় p1 = (3,2), থানকুনির স্থানাঙ্ক যদি হয় p2 = (7, 5)
তাহলে, dx = 7 – 3 = 4
dy = 5 – 2 = 3
তাহলে আমরা পাই,
ds^2
= 4^2 + 3^2
= 25
দূরত্ব ds তাহলে √25 = 5
জসীমের এই সুবিধা নাই। তাকে পাহাড় পার হয়েই যেতে হয়। আগের উদাহরণে 1D পথ ধরেছিলাম, এবার যদি 2D ধরি, তাহলে সূত্রটা এমন হতে পারে
ds^2 = a dx^2 + b dy^2
ধরো a = 3, b = 2.
আগের মতোই একই dx আর dy ধরে পাই
ds^2 = a dx^2 + b dy^2
= 3 * 4^2 + 2 * 3^2
= 66
বর্গমূল করে পাই, ds = √66 = 8.12
তার মানে, মাঝ রাস্তায় পাহাড় থাকায় 5 মিটারের রাস্তা বড় হয়ে 8 মিটার হয়ে গেছে।

৩.
বক্কর ভাই আছেন লুব্ধক নক্ষত্রের ওইদিকে, লক্কর আপুর কাছে। তাদের গ্রহের নাম প্ল্যানেট iedcr. তাদের গ্রহে থানকুনি পাতা পাওয়া যায় না। তাই বক্কর ভাইকে অতি রকেট নিয়ে পাশের গ্রহ kbfgh থেকে প্রতিদিন থানকুনি পাতা আনতে হয়।
এই গ্রহ আর iedcr এর সরাসরি দূরত্ব হচ্ছে 1 আলোকবর্ষ। তবে বক্কর ভাই সরাসরি গেলেও দেখা যাচ্ছে দূরত্ব অনেক বেশি লাগছে। তিন আলোকবর্ষ হয়ে যাচ্ছে। কোন কারনে রাস্তা লম্বা হয়ে যাচ্ছে।
ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে দূরত্ব মাপার জন্য পীথাগোরাসের সূত্র হচ্ছে,
ds^2 = dx^2 + dy^2 + dz^2
এই সূত্রে কাজ হচ্ছে না। রাস্তা লম্বা হয়ে যাওয়ায় দূরত্ব অনেক বেশি মনে হচ্ছে। বক্কর ভাইয়ের মনে হচ্ছে, দূরত্বের সূত্র হওয়া উচিত:
ds^2 = a dx^2 + b dy^2 + c dz^2
নাহলে কোনভাবেই হিসাব মিলছে না।
কিন্তু a, b আর c তো যোগ হয় রাস্তার উপর পাহাড় থাকলে। রাস্তা কোনভাবে বাঁকলে। এখানে পাহাড় আসবে কোথা থেকে? বক্কর ভাইয়ের জানা নেই। তিনি শুধু জানেন, রাস্তা লম্বা হয়ে গেছে মানে হচ্ছে, ধরে নেওয়া যায় রাস্তা বেঁকে গেছে। হয়তো অন্য কোন মাত্রায়, অন্য কোন দিকে।
বেঁকেছে ধরে নিলে লম্বা রাস্তার হিসাব মেলে।
৪.
আমরা dx^2 এর পাশে সহগ লিখেছি a, dy^2 এর পাশে লিখেছি b, dz^2 এর পাশে c.
খেয়াল করো, আমরা ধরে নিচ্ছি dx dy, dy dz, dz dx এসব টার্ম নাই। রাস্তা এমনভাবে বাঁকতেও পারে যখন এসব টার্মও প্রয়োজন হবে। বিস্তারিত বইয়ে বুঝাবো। তখন আমরা পীথাগোরাসের সূত্র এভাবে লিখতে পারি,
ds^2 = a dx^2 + b dy^2 + c dz^2 + d dx dy + e dy dz + f dz dx
নাহ, a, b, c, d নাম মিনিংলেস হয়ে যাচ্ছে, একটু ভালো নাম দরকার।
dx^2 এর সাথে যেটা গুণ আছে সেটার নাম দিলাম gxx. দুইটা x জন্য xx
dy^2 এর সাথে যেটা গুণ আছে সেটার নাম দিলাম gyy
…
dx dy এর সাথে যেটা গুণ আছে সেটার নাম দিলাম gxy
তাহলে আমাদের সমীকরণ হবে:
ds^2 = gxx dx^2 + gyy dy^2 + gzz dz^2 + gxy dx dy + gyz dy dz + gzx dz dx
এটুকু সবার কাছে তো ক্লিয়ার??
৪.
এই gxx, gyy এইসব জিনিস, যেগুলো একসাথে বুঝায় স্পেস আসলে কতটা বাঁকা, এগুলোকে এক সাথে বলে মেট্রিক টেন্সর। আর প্রতিটা জিনিসকে আলাদাভাবে বিলে মেট্রিক টেন্সরের কম্পোনেন্ট।
আমাদের জগৎ আসলে ত্রিমাত্রিক না, সেখানে চারটা মাত্রা। একটা মাত্রা সময়ের। সময় কেন মাত্রা, সেটা নিয়ে ধীরে ধীরে বুঝাবো।
এই চারমাত্রিক জগৎ যদি সমতল হয় তাহলে দূরত্বের ক্ষেত্রে মেট্রিক টেনসরের কম্পোনেন্টগুলোর মান থাকে 1, সময়ের ক্ষেত্রে সেগুলো থাকে -1. দূরত্বের ক্ষেত্রে কেন 1 সেটা নিশ্চয়ই ক্লিয়ার, সময়টা আগামীর জন্য রেখে দিলাম।
এই চার মাত্রিক জগৎটাকে এক কথায় বলে স্পেস টাইম। সেটা যদি সমতল হয় তখন তার নাম ফ্ল্যাট স্পেস টাইম। তখন সেখানে দূরত্বের সমীকরণ
ds^2 = -dt^2 + dx^2 + dy^2 + dz^2
আর যদি সমতল না হয়, তাহলে প্রতিটার সাথে নানা ধরনের মান গুণ হবে। তখন আর মেট্রিক টেন্সরের কম্পোনেন্টগুলোর মান 1 আর -1 এ সীমাবদ্ধ থাকবে না। আপাতত এটুকু জেনে রাখি, মাত্রা বেশি হয়ে যাওয়ায় অনেক সময়ই t x y z না ব্যবহার করে এগুলোর নাম দেয় t = x0, x = x1, y = x2, z = x3 এরকম। আর তখন মেট্রিক টেন্সরের কম্পোনেন্টগুলোর নাম হয় g00, g01, g02 এরকম। এই সব গুলো কম্পোনেন্টকে এক সাথে সুন্দর করে একটা টেবিলের মধ্যে রাখে, সেটার নাম দেই আমরা মেট্রিক টেন্সর।

৫.
যে জিনিস স্পেস টাইমকে বাঁকায়, অথবা টেনে লম্বা করে বা খাটো করে, যার জন্য বক্রতা মনে হয়, তার নাম হচ্ছে স্ট্রেস এনার্জি টেন্সর। সেটা অনেকদিন পরে কোন এক সময় বুঝাবো।
তার আগে আমাকে কয়েকটা জিনিস প্রমাণ করে আসতে হবে, শিখিয়ে আসতে হবে।
ক. স্পেসের সাথে সময় কেন মেলানো হচ্ছে?
খ. ds^2 = -dt^2 + dx^2 + dy^2 + dz^2 এই সূত্রের প্রমাণ কি?
গ. টেনসর আসলে কি মিন করে?
আর এই সব কিছু বুঝার আগে আমাদের আসলে স্পেশাল রিলেটিভিটি ক্লিয়ার হতে হবে। সাথে থাকো।
(ছবি ক্রেডিট: সমুদ্র)