কোয়ান্টাম ৩৫: কোপেনহ্যাগেন ইন্টারপ্রিটেশান



কোয়ান্টাম ৩৫
কোপেনহ্যাগেন ইন্টারপ্রিটেশান

আজকে থেকে আগামী কয়েক পর্ব পর্যন্ত কোয়ান্টাম মেজানিক্সের অদ্ভুতুড়ে ঘটনাগুলো বলে যাবো। আশা করি সাথে থাকবেন।

১।
বক্কর ভাই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তিনি জুয়া খেলছেন।
বক্কর ভাই তুখোড় জুয়ারি। জেল পালানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভাগ্য যতটা না ভালো, জুয়ার ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি ভালো। তিনি কখনোই জুয়ায় হারেন না।
লুডুর গুটি চালা হয়। বক্কর ভাই গুটি মাটিতে পড়ার আগেই বলে দেন কত উঠবে।
রুলেট হুইল ঘোরানো হয়। বক্কর ভাই আগে থেকেই বলে দেন কত উঠবে।

সবাই বলে, বক্কর সেই কপাল নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। বক্কর ভাই মুচকি মুচকি হাসেন। আফটার অল, বড় ব্রেইন থাকলে বড় কপাল তো হবেই!
বক্কর ভাইয়ের ব্রেইনটা আসলেই বড়। তাঁর চোখে একটা ছোট গোপন ক্যামেরা লাগানো আছে, সাথে একটা প্রসেসর। ক্যামেরা দিয়ে ছক্কার প্রতিটা মুহূর্তের ছবি ওঠে। কোন সময় সেটা কত অবস্থানে আছে, ভরবেগ কতো হবে, বোর্ডের সাথে কোন বেগে ধাক্কা লাগবে, ধাক্কা লাগার পর কত ডিগ্রি কোণে কত তরণে ছক্কাটা যাবে, প্রসেসরটা প্রতি মুহূর্তে ওই হিসাব করছে। ছোট খাট একটা প্রোগ্রাম লিখে দিলেই হয়, হিসাব করে বলে দিবে ছক্কা কোন সময়ে কোন জায়গায় থাকবে। বক্কর ভাইয়ের বিশাল ব্রেইনের জন্য ওইটা তেমন কোন ব্যাপার না।

তার মানে কি হলো? তার মানে হচ্ছে, ছক্কায় র‍্যান্ডম কিছু নেই। সব আগে থেকে জানা সম্ভব।

ছক্কা জানে তাতে শেষ পর্যন্ত কি উঠবে।

২।
লিটন দেওয়ান চিশতী তুখোড় ভবিষ্যৎ বক্তা। কিন্তু কিছুদিন ধরে তাঁর পাওয়ার কমে গেছে। ব্যাবসা ভাল চলছে না। কয়েকদিন আগে ম্যাজিস্ট্রেট এসে তাঁকে জরিমানা করে গেল, তিনি আগে থেকে জানতেও পারলেন না যে টাকা রেডি রাখতে হবে।
ব্যাবসা ভাল করার জন্য চিশতী সাহেব কি করতে পারেন?

তিনি পৃথিবীর প্রতিটা কোণায়, ম্যাজিস্ট্রেটের মাথার প্রতিটা নিউরনে, মানুষের কোষে কোষে সব জায়গায় একটা করে ক্যামেরা বসাতে পারেন। বিশাল একটা সুপার কম্পিউটারে সবকিছুর অবস্থান ভরবেগ হিসাব করে দেখতে পারেন। তাহলে হয়তো ভবিষ্যৎ বলাটা আরও নিখুঁত হবে।

৩।
এইবার আসি ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্টের কথায়। দুইটা স্লিট দিয়ে ইলেকট্রন যায়, পেছনের পর্দায় একটা একটা করে ইলেকট্রন জমা হয়। শেষ পর্যন্ত একটা ইন্টারফিয়ারেন্স প্যাটার্ন জমা হয়।

ধরি পর্দায় ১০টা জায়গা আছে।
এক নম্বর ইলেকট্রনটা এই দশ জায়গার যেখানে খুশি আসতে পারে।
কোন জায়গায় আসবে তার উপর ভিত্তি করে বক্কর ভাই একটা নতুন প্ল্যান আঁটলেন।
দশটা ঘরে ১০টা সুইচ বসানো হলো।
ইলেকট্রন যেই ঘরে আসবে সেখানকার সুইচে টিপ দিবে। ঘটতে থাকবে ঘটনা।

এক নাম্বার ঘরে আসলে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কে ঠাডা পড়বে।
দুই নাম্বার ঘরে আসলে বিল গেটসের মাথায় বাজ পড়বে।
তিন নাম্বার ঘরে আসলে জেফ বেজোসের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাচার হওয়া শুরু হবে বক্কর ভাইয়ের সুইস ব্যাঙ্কে।

কোনটা হবে এইবার? এইবার কি ছক্কার প্রেডিকশান কাজে দিবে? লিটন দেওয়ান চিশতী কি এইবার কোন উপকারে আসতে পারবেন?

৪।
আমরা হাইজেনবার্গ পর্বে দেখেছি, একই সাথে ইলেকট্রনের অবস্থান আর ভরবেগ পুরাপুরি নির্ভর করা সম্ভব না।
তার মানে, ইলেকট্রন বর্তমানে কোথায় আছে জানলেও আমি বলতে পারবো না সে কোনদিকে চলেছে।
এইবার সব প্রেডিকশন ফেইল করবে। কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না প্রথম ইলেকট্রনটা দেওয়ালের ঠিক কোন দিকে হিট করবে।
কেউ বলতে পারবে না কার মাথায় বাঁশ পড়বে, বিল গেটস নাকি জেফ বেজোস।

৫।
এইবার একটা প্রশ্ন করি, চিন্তা করেন।
আমরা না জানলেও ইলেকট্রন নিজে তো জানে সে কোথায় আছে?
আমরা মাপতে না পারলেও, তার তো একটা ভরবেগ আছে?
মাপতে পারছি না, তার মানে তো এই না যে ইলেকট্রন একই সাথে সব জায়গায় আছে। ইলেকট্রন নিশ্চয়ই কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আছে, নির্দিষ্ট ভরবেগে চলছে, আমরা শুধু জানতে পারছি না।
ইলেকট্রনের ভেতর নিশ্চয়ই কোন গোপন নিয়ম কানুন লেখা আছে, সে সেটা মেনে জায়গামত হাজির হচ্ছে, শুধু আমরা ধরতে পারছি না কি সেই নিয়ম??

না হলে, এক নাম্বার ইলেকট্রন কিভাবে বুঝল তাকে ২ নাম্বার ঘরে আসতে হবে, অন্য কোথাও নয়? সে কিভাবে বুঝল বিল গেটসের মাথায় বাঁশ মারাটা খুব দরকার?

৬।
নিলস বোর আর ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ১৯২৫ থেকে ২৭ পর্যন্ত সময়ে ডেনমার্কের কোপেনহ্যাগেন শহরে বসে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কতগুলো ব্যাখ্যা দেন, এর নাম কোপেনহ্যাগেন ইন্টারপ্রিটেশান। বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় মতবাদগুলোর মধ্যে এটা একটা।

কোপেনহ্যাগেন ইন্টারপ্রিটেশান অনুযায়ীঃ
$ কোন গোপন নিয়ম নেই। মাপার আগ পর্যন্ত ইলেকট্রন জানে না সে কোথায় আছে, কোন জায়গায় আছে। এক জায়গায় আছে নাকি একি সাথে দুই জায়গায় আছে। তার অবস্থান ভরবেগ এগুলোর একটা ওয়েভ ফাংশন আছে, সেখান থেকে জানা যায় কোন জায়গায় থাকার সম্ভাবনা কতো।

$ আমি যেই মুহূর্তে মাপবো, সেই মুহূর্তে ইলেকট্রনের ওয়েভ ফাংশন কল্যাপ্স করবে। ইলেকট্রন হুট করে এক জায়গায় চলে আসবে। আমি কি মেপেছি সেটা মুহূর্তে ঠিক করে দিবে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক, বিল গেটস আর জেফ জেজোসের ভাগ্য।

$ কিছু কমপ্লিমেন্টারি প্রপার্টি আছে, যেগুলোর একটা জানলে আমরা আরেকটা জানতে পারবো না। আমরা যদি অবস্থান মাপি ভরবেগ অনিশ্চিত হয়ে যাবে। এক অক্ষ বরাবর স্পিন মাপলে আরেক অক্ষ বরাবর স্পিন অনিশ্চিত হয়ে যাবে। সময় মাপলে শক্তি। এই নিয়মের নাম হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র, একে ভঙ্গ করা যায় না।

$ বড় জগতের ঘটনাগুলোতে বেশিরভাগ সময় সম্ভাবনাগুলো এমনভাবে গড় হয়ে যায় যে, আমাদের মনে হয় সত্যিকারের র‍্যান্ডম বলে কিছু নেই। আমরা প্রায় নিখুঁতভাবে ছক্কার অবস্থান আর ভরবেগ দুইই একইসাথে মাপতে পারি, তবে ১০০% নিখুঁতভাবে কোনদিন না।

৭।
কি প্রমাণ আছে যে ইলেকট্রন আসলে জানে না তাকে কোথায় যেতে হবে?
কি প্রমাণ আছে, যে আমি মাপলাম আর বিল গেটসের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেলো?
তার চেয়ে বড় কথা, আমার মাপার মধ্যে এমন কি জাদু আছে যে ইলেকট্রন হুট করে ১০টা জায়গার মধ্যে ঠিক ২ নাম্বার জায়গাটাতেই চলে আসবে??

আইনস্টাইন চরম বিরক্ত হলেন। বলে বসলেন, ঈশ্বর পাশা খেলেন না।
নিলস বোর জবাব দিলেন, ঈশ্বরকে কি করতে হবে সেটা তুমি বলার কে?!!

(চলবে)

One thought on “কোয়ান্টাম ৩৫: কোপেনহ্যাগেন ইন্টারপ্রিটেশান”

Leave a Reply