কোয়ান্টাম ৩৪
কোয়ান্টাম টানেলিং
১।
বক্কর ভাই জেলে আছেন। এইটা ব্যাপার না। তিনি প্রায়ই জেলে যান। কোন জেল তাকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারে না।
আক্কাস আলি, ঝাক্কাস আলি সবাই বক্কর ভাই বলতে অস্থির। সবার মুখে মুখে এক কথা, বক্কর ভাই একটা লেজেন্ড। জেল থেকে বের হলেই সবাই বক্কর ভাইকে চেপে ধরে, ভাই কেমনে কি? কিভাবে পারেন এইসব?
বক্কর ভাই তার সিক্রেট ফাঁস করেন না। শুধু মুচকি মুচকি হাসেন।
আসলে বলার খুব একটা কিছু নাইও। বক্কর ভাই আশাবাদী মানুষ। তিনি জাস্ট চোখ মুখ বন্ধ করে গারদের দিকে দৌড় দেন। কপালে একটা পট্টি বেঁধে নেন, যাতে গারদের সাথে ধাক্কা খেয়ে মাথা টাথা ফেটে না যায়।
বেশিরভাগ সময় তিনি ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েন না। লেজেন্ডরা কখনো হাল ছাড়ে না। কয়েক কোটি বার এভাবে দৌড়াদৌড়ি করার পর, একসময় তিনি নিজেকে দেখতে পান গারদের অন্যপাশে।
গারদ গারদের জায়গায় আছে।
আগের মতই তালা ঝুলছে।
শুধু বক্কর ভাই আছেন গারদের উল্টাপাশে।
হেটাররা বলবে, এটা ম্যাজিক।
বক্কর ভাই ভালো জানেন, এটা জাস্ট কোয়ান্টাম মেকানিক্স।

২।
উপরের ঘটনার নাম কোয়ান্টাম টানেলিং।
এর মাধ্যমে একটা কণা ভয়ঙ্কর সব বাঁধাকে পার করে আসতে পারে।
বক্কর ভাই হচ্ছে ওই কণা।
বিভব শক্তির বাঁধা হচ্ছে চারপাশের জেলখানা।
প্রথমে পৃথিবীর উদাহরণে আসি।
একটা বলকে মুক্তিবেগের চেয়ে কম কোন একটা আদিবেগে উপরের দিকে ছুড়ে দিলে সেটা পৃথিবীতে আবার ফিরে আসে।
মুক্তিবেগে ছুড়ে বের হয়ে চলে যায়।
কেন চলে যায়?
সে পালাতে পারে, কারণ, পৃথিবীর মহাকর্ষ বল যত দূরে যায়, ততো দুর্বল হয়। প্রথম দিকে হয়তো প্রতি মন্দন থাকে 9.8m/s, যত উপরে উঠে এই হার কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মন্দন শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছায়, পৃথিবী তাকে আর টেনে ফিরাতে পারে না। সে শেষ পর্যন্ত একটা বেগ নিয়ে পৃথিবী থেকে বের হয়ে যায়।
একটু চিন্তা করেনঃ
পৃথিবীর মহাকর্ষ বল যদি দূরত্বের সাথে না কমতো মুক্তি বেগ বলে কিছু থাকতো না। যত আদি বেগেই পাঠানো হোক না কেন, সে ঠিকই পৃথিবীতে ব্যাক করতো।
আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার চিন্তা করি। ধরেন পৃথিবীর মহাকর্ষ বল দূরত্বের সাথে কমে না, বরং বাড়ে! গুলতির মতো। যত দূরে যাবেন, ততো সে টেনে নামাবে। পৃথিবী থেকে তখন যে কোন আদিবেগ নিয়ে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। আপনাকে যেতে ত্বরণে।
এইবার কোয়ান্টাম জগতে আসি। এতদিনে নিশ্চয়ই এইটুকু ক্লিয়ার যে, ওই জগতের নিয়ম পুরাই উলটা পাল্টা, সবকিছু সম্ভাবনা দিয়ে চলে। তাই, এইখানে একটা কণাকে চারপাশে প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে বেঁধে রাখতে চাইলেও, একটু সম্ভাবনা থেকেই যায়, বক্কর ভাই জেল পালাবে।
একটু বুঝাই। যারা গণিত বুঝতে চান না, ৪ নাম্বারে চলে যান।
৩।
মনে আছে, তরঙ্গের বিস্তার
Ψ(t) = Ae^-iωt
যেটা কিনা একটা সাইন ওয়েভ আরেকটা কস ওয়েভের যোগফল?
জানি, কিচ্ছু মনে নেই। তারপরও লিখিঃ
ω = 2πf
E = hf
অতএব
ω = 2πE/h
= E/ℏ
আমরা পাই,
Ψ(t) = Ae^-iEt/ℏ
ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নাই, এই জিনিস শুধু বিস্তারের সাথে শক্তির সম্পর্ক দেখাচ্ছে।
অথবা, যদি আরেকটু ভয় দেখাই, Ψ এর কাহিনী এখানেই শেষ না। তরঙ্গ শুধু সময়ের সাথেই উঠে নামে না, দূরত্বের সাথেও চেঞ্জ হয়।
দূরত্বের সাথে কণার বিস্তারের সমীকরণঃ
Ψ(x) = Ae^ikx
k এর কাহিনী বলা হয় নি, বইয়ে বলব। আপাতত ধরে নেই, k জাস্ট একটা ধ্রুবক। এই সমীকরণকে শক্তি আকারে নিলে পাই,
Ψ(x) = Ae^ipx/ℏ
p হচ্ছে ভরবেগ।
পুরা সমীকরণ হলোঃ
Ψ(x,t) = Ae^-i(ωt – kx)
শক্তি আকারে,
Ψ = Ae^-i/ℏ(Et – px)
এই পর্যন্ত ক্লিয়ার?
শক্তি E জিনিসটার ৩টা অংশ, আভ্যন্তরীণ শক্তি যেটাকে ভর হিসাবে দেখি, গতিশক্তি আর বিভবশক্তি। আপাতত ধরে নিচ্ছি আভ্যন্তরীণ শক্তির কোন পরিবর্তন হচ্ছে না, শক্তি মানে বিভবশক্তি + গতিশক্তি।
E = V + p^2/2M
কণা যখন জেলখানায় ছিল তখন তার শক্তি
E1 = V1 + p1^2/2M
কণা যখন গারদে অর্থাৎ উচ্চ বিভবে যায় তখন তার শক্তি
E2 = V2 + p2^2/2M
কণাকে বাইরে থেকে কোন শক্তি না দেওয়া হলে তার মোট শক্তি অপরিবর্তিত থাকে, অর্থাৎ,
E1 = E2
V1 + p1^2/2M = V2 + p2^2/2M
p2^2/2M = V1 + p1^2/2M – V2
p2 = root((V1 + p1^2/2M – V2) × 2M)
V2 যদি V1 + p1^2/2M এর চেয়েও বড় হয়, তাহলে রুটের ভেতর আসবে নেগেটিভ সংখ্যা। কণার ভরবেগ p2 হবে কাল্পনিক!!
বাস্তব জগতে কণার ভরবেগ কাল্পনিক হওয়া অসম্ভব, কোয়ান্টাম জগতে এগুলো তেমন কোন ব্যাপার না।
আগে দূরত্বের সাথে কণার অবস্থান পাওয়া যেত
Ψ(x) = Ae^ipx/ℏ
দিয়ে, যেটা কিনা একটা জটিল তরঙ্গ, সাইন আর কসের মিশ্রণ।
p নিজেই যদি কাল্পনিক হয়, i, i গুন হবে। নতুন তরঙ্গ হবে
Ψ(x) = Ae^-px/ℏ
যেটা কিনা একটা বাস্তব তরঙ্গ, e এর নেগেটিভ পাওয়ার। খুব দ্রুত এই জিনিস কমতে কমতে শূন্য হবে, কিন্তু হুট করে এক মুহূর্তে নয়।
একেবারে শুন্য হওয়ার আগে কণা যদি আবার স্বাভাবিক দুনিয়ায় ফিরে আসতে পারে, সে জেল থেকে মুক্তি পাবে। বাইরের আলো বাতাসে দম ফেলতে পারবে।
প্রথম গ্রাফটাতে দেখা যাচ্ছে সময়ের সাথে ভরবেগের তরঙ্গের রিয়েল অংশটা। আগে সাইন ওয়েভ, পরে e এর নেগেটিভ পাওয়ার। দ্বিতীয় ছবিটাতে, বিস্তার কমতে কমতে একেবারে শূন্য হওয়ার আগে তরঙ্গ স্বাভাবিক, অর্থাৎ কাল্পনিক জগতে ব্যাক করেছে, তার তরঙ্গ আবার সাইন আর কস ওয়েভ হয়েছে।

মনে হয় কিছুই বুঝেন নই, যাই হোক, এবার কাজের কথায় আসি।
৪।
নিউক্লিয়াসের ভেতরের জগত একটা ভয়াবহ জেলখানা। সবল নিউক্লিয় বল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বল। প্রোটনগুলো একে অপরের সাথে সারাদিন মারামারি করে, কেউ কাউকে দেখতে পারে না। নিজেদের মধ্যে আছে তীব্র ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকর্ষণ, পলির অপবর্জন নীতি তো আছেই।
ভয়ঙ্কর শক্তিশালী সবল নিউক্লিয় বল এই বিদঘুটে, ঘারতেরা ঝগড়াটে প্রোটনগুলকে এক সাথে ধরে রাখে, প্রায় কেউই পালাতে পারে না।
দুইটা প্রোটন দুইটা নিউট্রন নিয়ে হয় আলফা কণা। একেকটা আলফা কণা বারবার চেষ্টা করে নিউক্লিয়াসের জেল থেকে বের হতে, পারে না। ইউরেনিয়ামের গড় আয়ু সাড়ে চার বিলিয়ন বছর। এই সাড়ে চার বিলিয়ন বছরে গড়ে একটা আলফা কণার হয়তো সাধ্য হয় নিউক্লিয়াসের জেল থেকে বের হয়ে আসার।
কোয়ান্টাম টানেলিং না থাকলে এই ঘটনা জীবনেও সম্ভব হতো না।

৫।
শেষ করার আগে একটা প্রশ্ন, সত্যিকারের মানুষ বক্কর ভাইয়ের আসলেই কি কোন সম্ভাবনা আছে এভাবে দেয়াল ভেদ করে বের হওয়ার?
কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে, আছে।
সম্ভাবনাটা খুবই খুবই কম।
একের পর ২৮টা শুন্য নেন। ১০ ^ ২৮।
এইবার ১এর এর ওই ১০ ^ ২৮ টা শুন্য নেন। যে অকল্পনীয় বিশাল সংখ্যাটা হবে, বক্কর ভাইয়ের বের হওয়ার সম্ভাবনা তত ভাগের এক ভাগ।
ব্যাপার না, বক্কর ভাই আসলেই লেজেন্ড!