কোয়ান্টাম ৩৩
আগুন
এই আর্টিকেলটা অনেক অনেকদিন আগেই লেখা উচিত ছিল, বোরের বর্ণালি বিষয়ক আর্টিকেলের পরপর। আগে লেখা হয় নাই, এখন লিখছি। সামনে নিত্যদিনের বিজ্ঞান নিয়ে আরেকটা সিরিজ চালু করা প্ল্যান আছে, সেখানে আগুন, বেগুণ, নিউটন, ফোটন এইসব হাবিজাবি জিনিস থাকবে, সেখানে দরকার হলে এই সিরিজ থেকে কপি মারবো।
আমি কিছু একটা লিখতে গেলে এমনিতেই একটু পর রঙ চং মাখিয়ে গল্প হয়ে যায়, আজকে ওই অভ্যাসটা একটু দমন করার চেষ্টা করব। আগুনের এমনিতেই অনেক রঙ, নতুন করে রঙ চরানোর দরকার নেই। আজকে কাঠখোট্টা বিজ্ঞান চলবে।
প্রশ্নঃ আগুন কি জিনিস? খায় না মাথায় দেয়? এটা কি শক্তি? এটা কি প্লাজমা?
উত্তরঃ ফেললেন তো বিপদে। আগে দুইটা জিনিস একটু ক্লিয়ার করি।
বাংলায় আমরা আগুন বলেই খালাস। ইংরেজিতে দুইটা টার্ম আছে। Fire আর Flame. একটাকে কি আগুন আরেকটাকে শিখা বলা উচিত? হয়তো।
আগুন (fire) হচ্ছে একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া। এমন একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া যেখানে জারণ (oxidation) হয়, তারফলে অনেক তাপ, আলো ইত্যাদি বের হয়। এই বিক্রিয়া একদিকে শুরু হলে চারপাশে ছড়িয়ে পরে।
আগুনের শিখা (flame) হচ্ছে গ্যাস। গরম গ্যাস, সেখানে ইলেকট্রন এক স্তর থেকে অন্য স্তরে দৌড়াদৌড়ি করে। উচু স্তর থেকে নিচু স্তরে ব্যাক করলে সে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির আলো ছাড়ে, আমরা ওই আলো দেখি। আগুনের শিখা আমাদের পরিচিত পদার্থ, এটা অপদার্থ না, শক্তিও না।
প্লাজমা হলো প্রায় সম্পূর্ণ আয়নিত গ্যাস। ধরেন যে একটা পরমাণু থেকে সবগুলো ইলেক্ট্রন বাইরে বের হয়ে ঘুরাঘুরি করছে, আর নিউক্লিয়াসগুলো আলাদা ঘুরছে, সেটাকে বলব আমরা প্লাজমা। বেশি গরম আগুনে প্লাজমা থাকতে পারে।

আগুনের শিখা থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। জ্বলন্ত কয়লায় শিখা থাকে না।
আগুন খাওয়া বা মাথায় দেওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, বাসায় ট্রাই করা উচিত না।
প্রশ্নঃ অক্সিজেন ছাড়া কি আগুন জ্বলে না?
উত্তরঃ আবারো বিপদে ফেললেন। এইটার উত্তর নির্ভর করে আগুনের সংজ্ঞার উপর।
ধরেন, একজন কট্টরপন্থী কেমিস্টকে ডেকে আনলাম।
আমি : ভাই সূর্যে তো আলো জ্বলছে অক্সিজেন ছাড়া। শিখাও আছে। ওইটা কি আগুন না?
কট্টরপন্থী কেমিস্টঃ ওইটা সহিহ আগুন না।
আমি : ভাই টাংস্টেন লাইটের কথা ?
কট্টরপন্থী কেমিস্টঃ ওইটাও সহিহ আগুন না।
কাহিনী কি?
কাহিনী হচ্ছে, একটা জিনিস গরম করলেই কি আলো দিবে। বিক্রিয়া না হলেও চলে। বাতাসকে যথেষ্ট গরম করলেও সেখান থেকে আলো বের হবে। আপনার বাসার টাংস্টেন লাইটের ভেতরে কোন অক্সিজেন নাই, সেটা কিন্তু আলো ঠিকই দিচ্ছে, চারপাশে একটা শিখার মতোও দেখা যায়। আকাশে সূর্য গনগন করে আলো দিচ্ছে। সূর্যে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম। হাইড্রোজেনের ফিউসান হয়ে সূর্য দেড় কয়টি ডিগ্রি সেলসিয়াসে জ্বলছে। সেটা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া, রাসায়নিক বিক্রিয়া না।
তাহলে আমরা কি বুঝলাম?
আমরা বুঝলাম, আলো দিতে, গ্যাসে আলো জ্বালাতে আগুন লাগে না। যদি শুধুমাত্র জারণ বিক্রিয়া হয়, আর সেখান থেকে আলো আর তাপ বের হয় সেটাকে আগুন বলে।
আবারও কট্টরপন্থী কেমিস্টকে ডাকলাম।
আমিঃ জোনাকির পেছনে তো জারণ বিক্রিয়া হয়। অক্সিজেনো লাগে। জোনাকি কি আগুন জ্বালাচ্ছে?
কট্টরপন্থী কেমিস্টঃ না। যথেষ্ট তাপ হয় নাই। ওইটা সহিহ আগুন না।
আমিঃ আচ্ছা বুঝলাম। কিন্তু অক্সিজেন ছারাও তো জারণ হয় নাকি? ক্লোরিন ট্রাইফ্লুওরাইডের তো ভয়াবহ শক্তিশালী শিখা হয়, সবকিছুকে ছারখার করে ফেলে, ওইটা কি আগুণ?
কট্টরপন্থী কেমিস্টঃ হ্যাঁ, যেহেতু জারণ হচ্ছে, ওইটাকে আগুন বলা যায়।
অতি কট্টরপন্থী দ্বিতীয় কেমিস্টঃ না। ওইটাও আগুন না। অক্সিজেন ছাড়া আগুন জ্বলে না। অক্সিজেন ছাড়া যে জিনিস জ্বলছে ওইটা আগুন না।
আমিঃ :X
বুঝেন ঠ্যালা! আমি অবশ্য বাঙ্গালি, আমার জ্বলন্ত গ্যাস দেখলেই আগুন মনে হয়। যে কেমিস্ট বলে সূর্যে আগুন জ্বলে না তাঁকে মারতে ইচ্ছা করে।
অনেকক্ষণ বকর বকর করলাম। এইবার একটু শিখা দেখে আসি।
একটা শিখা কেমন হবে, তার আঁকার আকৃতি, রঙ এগুলো নির্ভর করে কি জিনিস জ্বলছে, তাপমাত্রা চাপ কি পরিমাণ আছে তার উপর। আমরা অতো ঝামেলায় না যেয়ে একটা সহজ সরল মোমের আগুন দেখে আসি আজকে।
মোমের শিখার ৫টা অংশ।
১। একদম সুতার পাশের নিচের দিকের জায়গাটার নাম Non Luminous Zone । অন্ধকার জায়গা। এই জায়গায় অক্সিজেনের অভাবে কোন দহন হয় না। দহন না হলেও, তাপমাত্রা থাকে ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ফুটন্ত পানির তাপমাত্রার প্রায় ৬ গুন।
২। নিচের বাইরর দিকের অংশটার রঙ Blue Zone. এই স্তর প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন পায়। তাপমাত্রা উঠে প্রায় ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। মোম হচ্ছে হাইড্রোকার্বন। এই স্তরে প্রচণ্ড তাপে বড় হাইড্রোকার্বন ভেঙ্গে ছোট ছোট হাইড্রোকার্বন, মুক্ত কার্বন অণু C2 আর হাইড্রোজেন তৈরি হওয়া শুরু হয়।
৩। নীল এলাকার উপরের অংশটা আশেপাশের এলাকার তুলনায় অনেকখানি অন্ধকার। এর নাম তাই Dark Zone. এখানেও হাইড্রোকার্বনের ভাঙ্গন চলতে থাকে, আর ছোট ছোট নানা আকারের কার্বনের ছাই তৈরি হয়। তাপমাত্রা উঠে ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। ভেতরের দিকে হওয়ায় এখানে অক্সিজেনের বেশ অভাব।
৪। Dark Zone এর উপরে মোমের হলুদ উজ্জ্বল অংশটার নাম Luminous Zone. এই জায়গায় কার্বনের অসম্পূর্ণ দহন হয়। তীব্র বিক্রিয়ায় নানান তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দৃশ্যমান আলো বের হয়, মানুষের চোখে একে দেখতে হলুদ থেকে সাদা মনে হয়। তাপমাত্রা প্রায় ১২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
৫। উপরের প্রায় অনুজ্জ্বল নীল জায়গাটার নাম Non Luminous Veil. এই স্তর আসলে নিচের নীল অংশটার বাইরের অংশ। মোমের সবচেয়ে গরম জায়গা এইটা। তাপমাত্রা প্রায় ১৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। প্রচণ্ড তাপে এখানে কার্বনের ছাই পুড়ে চো২ তৈরি হয়।

একটা সামান্য মোমের শিখা কি পরিমাণ পাওয়ারফুল বুঝতে হলে দেখতে হবে :
১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি ফুটে যায়।
৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে অ্যালুমিনিয়াম গলে।
১০৬৩ ডিগ্রিতে সোনা গলে যায়, ১০৮৪ তে তামা।
খাঁটি লোহার গলনাঙ্ক ১৫৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ১১০০র উপরে গেলেই কিন্তু নানান জাতের ভেজাল মেশানো লোহা গলতে শুরু করে।
আগামী পর্বে শিখা পরীক্ষা, আর ক্লোরিন ট্রাইফ্লুওরাইডের আগুন দেখে এসে এই গল্প শেষ করব।
http://candles.org/candle-science/
http://www.pysanky.info/Chemistry/Candle_Flame.html
শিমুল
এটা বাধিয়ে রাখার মত লেখা! আগুন নিয়ে অনেক আর্টিকেল পড়েছি, কোনটিই বুঝিনাই। আজ আগুন সম্পর্কে সব ধারণা ক্লিয়ার হল।