কোয়ান্টাম ১১
লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার
১।
আলোর বেগের 99.999999 % বেগ। অকল্পনীয় গতি।
এই মারাত্মক গতিতে একটা ট্রেইন চলছে।
তার প্রতি এক কেজির ওজন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০৭১ কেজি।
ওই ট্রেইনে বসে এক সেকেন্ড ধরে আপনি যদি একটা মশা মারেন বাইরের মানুষ সেটা দেখবে ২ ঘণ্টা ধরে।
ওই ট্রেইনে এক দিন কাটিয়ে আসলে ট্রেইন যখন ব্রেক কষবে পৃথিবীতে পার হয়ে যাবে ১৯টা বছর।
১০ কিলোমিটার লম্বা ট্রেইনটা ছোট হয়ে হয়েছে মাত্র দেড় মিটার।
কিভাবে এগুলো হবে? কেনই বা হবে?
এখন আর বলব না। আমার রিলেটিভিটি সিরিজ পড়ে আসতে হবে, বিজ্ঞানে অজ্ঞান বইয়ে আছে।
ওই ভয়ঙ্কর ট্রেইনটা কল্পনা না, বাস্তব। ওই ট্রেইনটা আছে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে। আজকের গল্প, LHC র গল্প।

২।
দাঁড়িপাল্লার একপাশে পাগলামি, আরেকপাশে জিনিয়াস রাখলে যে ব্যাল্যান্স তৈরি হবে, পল ডিরাক ছিলেন সেই জিনিস। ফিজিসিস্টদের যদি প্রশ্ন করা হয়, আইনস্টাইনের পর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী কে, উঠে আসবে ডিরাকের নাম। আজকে এই স্বল্পভাষী আধপাগল মানুষটার সাথে পরিচয় করানোর সময় নেই।
আজকে দুই চার কথায় ডিরাকের আন্টিম্যাটারের গল্প বলি।
কোয়ান্টাম ৯ এ বোরের পরমাণুর কথা বলেছি। ওই পরমাণুতে ইলেকট্রন E = hf শক্তি ত্যাগ করে নিচের স্তরে যায়। একসময় নিচের স্তরে যেতে যেতে কি হবে? ইলেকট্রন শূন্য শক্তি স্তরে যাবে, তাইতো? তারপর?
ডিরাক দেখান, তারপর ইলেকট্রন আরও শক্তি ত্যাগ করে নেগেটিভ স্তরে যাওয়ার চেষ্টা করে। যেতে পারে না, কারণ ওই নেগেটিভ স্তর অলরেডি ইলেকট্রন দিয়ে ভর্তি আছে।
পরমাণুর বাইরের যে ফাঁকা জায়গাটা, যাকে আমরা স্পেস বলি, ভাকিউয়াম বলি, সেটা ডিরাকের নেগেটিভ শক্তি স্তর। ওখানে ঘুরছে অগণিত ভার্চুয়াল ইলেকট্রন। বাস্তব জগতের সত্যিকারের ইলেকট্রনগুলো ওখানে যেতে পারে না, মিথ্যা ইলেকট্রনগুলোর জন্য। যথেষ্ট শক্তি দিলে নেগেটিভ শক্তি স্তর থেকে একটা ইলেকট্রন বাস্তব জগতে উঠে আসে। রেখে আসে ইলেকট্রন সাইজের একটা গর্ত, দেখতে শুনতে ইলেকট্রনের মতো, শুধু চার্জ উলটা। ওই গর্তটার নাম পজিট্রন। আবার যদি কোনোদিন ইলেকট্রন পজিট্রন ধাক্কা লাগে, বাস্তবের ইলেকট্রন আবার অবাস্তব জগতে ফিরে যায়, রেখে আসে প্রচণ্ড শক্তি। ইলেকট্রন পজিট্রন ধ্বংস হয়, জন্ম হয় ফোটনের।
৩।
মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় মেশিনের নাম লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার। ফ্রান্স সুইজারল্যান্ডের বর্ডারে মাটির ১০০ মিটার গভীরে আছে ২৭ কিলোমিটার লম্বা একটা টানেল। ওই টানেলের গায়ে বসানো আছে -২৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠাণ্ডা করা সুপারকন্ডাক্টিং ইলেক্ট্রোম্যাগনেট ।
প্রোটনের দুইটা সূক্ষ্ম রশ্মি ওই সাতাশ কিলোমিটার রাস্তায় উলটা দিকে ঘুরছে।
প্রোটনের ট্রেইন একটার পর একটা পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটরের ভেতর দিয়ে যায়, আস্তে আস্তে স্পিড বাড়ে।
দুই দিক থেকে আসা দুইটা ট্রেইনের স্পিড যখন আলোর বেগের 99.999999% হয়, তখন মুখোমুখি ধাক্কা লাগে তাদের।

এই প্রচণ্ড শক্তিতে জন্ম হয় নানান জাতের কণা আর প্রতিকণাদের।
বিগ ব্যাঙের পরপর, অতি আদিম, অতি প্রাচীন মহাবিশ্বে ভয়ঙ্কর শক্তি দিয়ে যেসব আশ্চর্য কণার জন্ম হয়েছিল, LHC তাদের নতুন করে তৈরি করছে।
আজকে আর্টিকেল বড় হয়ে যাচ্ছে। ওই কণাগুলোর গল্প আরেকদিন বলব। হিগস বোজোনের কাহিনীটাও আজকে বাকি থাকলো।

বোর অনেকক্ষণ ধরে বসে বসে বোর হচ্ছে, তাকে একটু সময় দেওয়া দরকার।
(চলবে)