কোয়ান্টাম ৪৫ : শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ ১



কোয়ান্টাম ৪৫
শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ ১
সমীকরণের সন্ধানে

১।
১৯২৪ সাল।
লুই ডি ব্রগ্লির থিসিস পেপার চেক করা হচ্ছে। পরীক্ষকরা বিভ্রান্ত, হতভম্ব। খুব সাদামাটা ভাষায় সেখানে অবিশ্বাস্য একটা জিনিস দাবী করা হয়েছে। আপনি আমি আমাদের শরীরের সবগুলো কণা নাকি আসলে তরঙ্গ!
সেই সময়, প্রফেসর ল্যাংজেভিন এমন একটা কাজ করলেন, যেটা না করলে ফিজিক্স হয়তো আরও বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে যেত।
তিনি আইনস্টাইনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন ডি ব্রগ্লির থিসিস পেপার।

আইনস্টাইন পেপারটা পড়লেন।
পড়ে শিহরিত হলেন।
ল্যাংজেভিনকে তিনি লিখলেন, He has lifted the corner of a great veil.
ওপারে আছে অতি রহস্যময় ভয়ংকর এক দুনিয়া। একটা ভারি মোটা মখমলের পর্দা ওই দুনিয়াকে আমাদের থেকে আলাদা করে রেখেছিল। লুই ডি ব্রগ্লি ওই পর্দার কোণা সামান্য ফাঁক করেছেন।
পর্দার ওপাশে আলো আধারিতে দেখা যাচ্ছে এক আশ্চর্য রহস্যময় জগৎ!

২।
এক বছর পরের কথা।
ডি ব্রগ্লির থিসিস পেপার পাবলিশ হয়েছে। দুনিয়াবাসি আস্তে আস্তে জানছে কোয়ান্টাম রাজ্যের খোঁজ খবর।
পুরো সিরিজ জুড়েই একটু একটু করে সেই গল্পগুলো বলেছি।
ল্যাম্বডার গল্প।
সাইয়ের গল্প।
শুধু বলি নি সেই গল্পের আসল গল্পকারটির কাহিনী।

১৯২৫ সালের কোন এক অলস দুপুরে আমাদের গল্পকার বসে বসে আইনস্টাইনের লেখাগুলো পড়ছেন। তাঁর চোখে গোল গোল চশমা, বয়স হয়েছে ৩৮। তিনি পদার্থবিদ, মাউন্টেইন ক্লাইম্বার, স্কিয়ার। তীব্র নারীলোভি তিনি। তাঁর আছে অনেক শয্যাসঙ্গি। জীবনকে যত দিক দিয়ে উপভোগ করা যায় তিনি করছেন।
আইনস্টাইনের লেখাগুলো পড়ে ৩৮ বছর বয়সী নারিলোভী প্রফেসরের চোখ চকচক করছে। তাঁর সামনে বিশাল এক পাহাড়। তিনি পর্বতারোহী। এই পাহাড় তাঁকে বাইতেই হবে।

মঞ্চে প্রবেশ করছেন অস্ট্রিয়ান ফিজিসিস্ট, বিড়াল মানব, পার্ভার্ট প্রফেসর আরভিং শ্রোডিঙ্গার। এই মহাপুরুষ নিজ হাতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দ্বিতীয় জন্ম দিয়ে গেছেন। তাঁর জন্য সশ্রদ্ধ সালাম!

৩।
Ψ এর কথা মনে আছে?
ওই যে ম্যাটার ওয়েভের বিস্তার, যেটা দিয়ে বের কণা কোথায় থাকে সেটার সম্ভাবনা?
না থাকলে, কোয়ান্টাম ২১ থেকে পড়া শুরু করতে হবে।

বলেছিলাম,
Ψ = e^iθ
যেটাকে অয়লারের সমীকরণের সাহায্যে ভাঙলে পাই
Ψ = cos θ + i sin θ
সময়ের সাপেক্ষে তরঙ্গের পরিবর্তনের হার ω হলে, আর দূরত্বের সাথে এই হার k হলে,
θ = ωt – kx

তরঙ্গের দুইটা পার্ট। একটা সাইন তরঙ্গ। আরেকটা ওইটার সাথে সমকোণে কস তরঙ্গ।

প্রশ্নঃ তরঙ্গ কেন সাইনের মতো দেখতে হবে?
কাল্পনিক অংশটা বাদ দেন।
ম্যাটার ওয়েভ ভুলে যান।
সাধারণ একটা আলো বা শব্দ তরঙ্গ নিয়ে ভাবেন।
যারা মিউজিক নিয়ে কাজ করেছেন, কোনদিন দেখেছেন তরঙ্গ আসলে সাইন বা কসের মতো সিম্পল হয়?
তরঙ্গ হয় হিজিবিজি, আঁকাবাঁকা, নিরন্তর ওঠানামা।

সরলতার জন্য এখানে দূরত্বের সাথে পরিবর্তন বাদ দিচ্ছি। শুধু সময় ধরলেও,

তরঙ্গ হতে পারে
Ψ = 5t^2 – 7t
তরঙ্গ হতে পারে
Ψ = log (35t) / 23
তরঙ্গ হতে পারে
Ψ = (t -1)^3 cos ωt
আপনাকে কে বলেছে তরঙ্গকে আপনার কথামত সাদামাটা সাইন আর কসের মধ্যে থাকতে হবে?

তাই যদি হয়,
তাহলে কেন তরঙ্গের মধ্যে সাইন আর কস আসে?

তার কারণ, মহান গণিতবিদ ফুরিয়ে সেই সতেরশো সালে দেখিয়ে গেছেন, যেকোনো তরঙ্গকে আপনি আসলে শুধু সাইন আর কসের যোগফল আকারে প্রকাশ করতে পারবেন।
আপনি গোল তরঙ্গ চান? কয়েকটা সাইন আর কস তরঙ্গ যোগ করেন। একেকটা একেক ωতে চেঞ্জ হবে। একেকটাতে আদি কোন θ একেক রকম হবে।
আপনি চারকোনা তরঙ্গ চান? একই কথা। শুধু কয়েকটা সাইন আর যোগ করেন।
বিশ্বাস হচ্ছে না? নিচের ছবিগুলো দেখেন। তারপরও না মানতে পারলে, ফুরিয়ে সিরিজ নিয়ে পড়াশুনা করতে হবে।
এমনকি কসও লাগবে না। সাইনের সাথে ৯০ ডিগ্রি কোন যোগ করলেই কস আসে।

তার মানে, যেকোনো তরঙ্গকে এই আকারে প্রকাশ করা যায়ঃ
Ψ(t) = A1sin (ω1t + θ1) + A2 sin (ω2t + θ2) + A3 sin (ω3t + θ3) + ….

এইটুকু অংশ চিন্তা করতে হবে। শ্রোডিঙ্গার ভেবেছিলেন, ফুরিয়ে ভেবেছিলেন, আপনাকেও ভাবতে হবে।

৪।
Ψ মানে কি?
Ψ মানে কোন সময়ে, কোন জায়গায় কণাকে খুঁজে পাওয়ার বিস্তার (কোয়ান্টাম ২১, ২২, ২৩) । সেটা জানতে পারলে, বর্গ করে জানতে পারবেন কণাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা।
কণা খুব রহস্যময় মানুষ।
তিনি এমন আচরণ করেন যেন একই সময় একাধিক জায়গায় থাকেন (কোয়ান্টাম ৩০ – পরবর্তী) ।
কিন্তু তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি হুট করে এক জায়গায় চলে আসেন।

কণা বাবাজী আক্কাস আলী আজ পটুয়াখালী কাল সোনারগাঁও থাকেন। সকাল দশটায় রংপুরের তামাকের আড়তে তো দুপুরে টেকনাফের শুটকি পল্লিতে।

কেউ ঠিকমতো বলতে পারবে না তিনি এর পরে কোথায় থাকবেন। কিন্তু সম্ভাবনা আছে, শুটকির চালান এসেছে মিয়ানমার থেকে, টেকনাফে তাঁর থাকার সম্ভাবনা অনেক। রংপুরের তামাকের আড়তে পরে নজর দিলেও চলবে।
তার সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হলে আমাদের টেকনাফে রওনা দিলে ভালো হয়। তাঁর গাড়িও হয়তো এই মুহূর্তে টেকনাফের দিকেই চলেছে।

কণা কখন কোথায় থাকে আমাদের জানা নাই। তাকে কোথায় পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি সেটা জানতে হলে আমাদের জানতে হবে কণার Ψ.

ঝামেলা হচ্ছে, সেটাও আমাদের জানা নেই। Ψ যা খুশি হতে পারে।
কিন্তু একটা জিনিস আমরা জানি Ψ কে সাইন কসের যোগফল আকারে প্রকাশ করা যায়।
তাঁর মানে, Ψ লিনিয়ার।

৫।
প্রফেসর শ্রোডিঙ্গার স্কি করছেন। ঠিক মন বসাতে পারছেন না। তাঁর কলিগ ডেব্বি তাঁর আইডিয়াগুলোকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাচ্ছিল্য করে বলেছেন, যতদিন একটা তরঙ্গ ফাংশন না পাওয়া যায়, তরঙ্গ নিয়ে কথা বলা অর্থহীন।
আসলেই তো।
একটা সমীকরণ লাগবে।
এমন একটা সমীকরণ যেটা দিয়ে Ψ বের করা যায়।
এমন একটা সমীকরণ যেটা দিয়ে আরেকটা সমীকরণ বের করা যায়।
ওই সমীকরণটাতেই আছে ক্ষুদ্র জগতের সব রহস্যের সমাধান।
তাঁর মাথায় এখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

ক্রিসমাসের ছুটি শেষ।
শ্রোডিঙ্গার বাড়ি ফিরে এলেন।
ঘোষণা দিলেনঃ My colleague Debye suggested that one should have a wave equation; well, I have found one.

আমার কলিগ বলেছিল একটা তরঙ্গ সমীকরণ দরকার, আমি একটা পেয়েছি।


সেই মুহূর্তটা কেমন লাগছিলো শ্রোডিঙ্গারের?
আমি হলে থরথর করে কাঁপতাম।
তিনি কি কাঁপছিলেন?
তাঁর চোখে কি পানি এসেছিলো?

কি ছিল সেই সমীকরণ?

Leave a Reply