কোয়ান্টাম ৪৬
রঙের গল্প
রঙ আসলে কয়টা? তিনটা? সাতটা? অসংখ্য?
বিশাল জটিল গল্প। চলুন সহজ করে শুনি।
১।
রঙের গল্প শোনার আগে শুনে আসি আমরা কিভাবে দেখি।
ইলেকট্রন এক শক্তি স্তর থেকে অন্য শক্তি স্তরে গেলে আলো ফোটন বের হয়। এই ফোটন চোখে এসে পড়লে রেটিনার রড আর কোন কোষগুলোতে আয়োডিন ঘটিত নানান এক ধরণের বিক্রিয়া হয়। সেখান থেকে এক ধরণের ইলেকট্রিক সিগন্যাল তৈরি হয়। সেটা ব্রেইনের ভিজুয়াল কর্টেক্সে আসলে দেখার অনুভূতি তৈরি হয়।
রেটিনার কোন পজিশনে কয়টা ফোটন এসেছে সেটা থেকে বস্তুর ম্যাপ তৈরি হয়। আপনি আপনার সামনের ছেলেটাকে দেখছেন, তার কারণ তার শরীরের প্রতিটা বিন্দু থেকে গুলির মতো ফোটন বের হচ্ছে। এই প্রতিটা ফোটন তার শরীরে জন্ম হয়েছে। দেয়ালে গুলি পড়লে যেরকম ফুটা ফুটা একটা ছবি তৈরি হতো, ঠিক তেমনি ফোটনগুলো লেন্স দিয়ে আপনার চোখে এসে একটা ছবি তৈরি করে। ছবিটা উলটা থাকে, ব্রেইন এটাকে সোজা করে।

এই পর্যন্ত শুনে অনেকে আঁতকে উঠবেন। ফোটন নাকি সূর্যে হয় খালি? ছেলের গা থেকে ফোটন জন্ম হয় মানে কি?
ভালো করে শুনেন।
সূর্যের ফোটন সূর্যে হয়।
চাঁদের ফোটন চাঁদে।
ছেলের ফোটন ছেলেতে।
ছাদের ফোটন ছাদে।
চাঁদের নিজস্ব আলো নেই, তার মানে এই না যে সে ফোটন বানাতে পারে না। সূর্য থেকে আসা ফোটন সে শোষণ করে, তারপর নিজে ফোটন জন্ম দেয়। চাঁদের নিজের এমন শক্তি নেই যেটা দিয়ে ফোটন না খেয়েই সে জ্বলজ্বল করবে। চাঁদ খায় তারপর টয়লেট করে।
আলোর প্রতিফলন মানে ফোটন খেয়ে ফোটন দেওয়া।
চাঁদের কথা থাক। রঙের কথায় আসি। আমরা এতক্ষণ ধরে যে গুলির মতো ফোটনের গল্প করলাম তাতে সুন্দর করে মানুষের ছবি উঠবে ঠিকই, রঙ বলতে কিছু থাকবে না । রঙ তাহলে কোথা থেকে আসে?
ভালো করে শুনেন। রঙ বলতে আসলে কিছু নাই।
ফিজিক্সে লাল নীল বলে কিছু নাই।
খালি আছে ফোটন। আর ফোটনের তরঙ্গ রূপ।
আমাদের ব্রেইন আলাদা আলাদা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের, অর্থাৎ আলাদা আলাদা ফ্রিকোয়েন্সির আলোকে আলাদা রঙে দেখে।
পুরো জিনিসটা কল্পনা।
পুরোটাই ব্রেইনে তৈরি।
আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক বিশাল রেঞ্জের হয়। বেশিরভাগ আমরা দেখি না। যেটুকু দেখি সেটাকে ব্রেইন নানান রঙে রাঙায়।
ঠিক কিভাবে রাঙায়?
জিনিসটা কিছুটা জটিল। খেয়াল করে পড়তে হবে।

২।
সাদা আলোকে প্রিজমে পাস করলে সেটা কোটি কোটি রঙে ভাগ হয়।
কয়টা রঙে ভাগ হয়?
অগণিত।

এই অগণিত রঙকে আমরা ১০টা ভাগে ভাগ করতে পারতাম। ৮টা ভাগেও ভাগ করতে পারতাম। ৩০০টা ভাগেও ভাগ করতে পারতাম।
আমরা সাতটা ভাগে ভাগ করেছি। কেন করেছি?
খুশিতে। ঠেলায়। ঘুরতে।
নাম দিতে ভালো লাগে তাই।

ছবিটা খেয়াল করেন। অগণিত রঙ। বামে বেগুনী আসতে আসতে চেঞ্জ হয়ে নীল হয়েছে। কোন হুট করে পরিবর্তন নেই।
ঠিক কোন পয়েন্টে বেগুনী থেকে নীল হয়েছে কেউ বলতে পারবে না। সাতটা রঙ কেবলই সাতটা নাম।
এইযে রংধনুর এই অগণিত রঙ, প্রকৃতিতে প্রতিটার আলাদা আলাদা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আছে।
এই খানে প্রতিটা রঙ মৌলিক।
৬০০-৬৮০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের যে জায়গাটুকুকে আমরা কমলা বলছি সেটা আসলেই কমলা।
ভালো করে খেয়াল করেন।
আকাশে রংধনুর দিকে তাকালে যে কমলা রঙ দেখছেন সেটা লাল আর সবুজের মিশ্রণ নয়।
সেটা ‘বিশুদ্ধ’ কমলা।
শুধু কমলা কেন, রংধনুর সবগুলো রঙ মনোক্রোম্যাটিক। তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর একটা। তিন চারটা আলো মিলে তৈরি হয় নি।
আকাশে রংধনুর রঙগুলো লাল, নীল আর সবুজ এই তিনটা রঙের সমষ্টি না। এগুলো বিশুদ্ধ রঙ।
৩।
তাই যদি হয়, তাহলে মৌলিক রঙ আসলে কি জিনিস?
এইবার খেয়াল করেন।
যে রঙটাকে আমরা কমলা বলি, সেটা হতে পারে ৬৫০ ন্যানোমিটারের বিশুদ্ধ আলো।
হতে পারে লাল আর সবুজ আলোর মিশ্রণ।
কমলা = ৬৫০ nm
কমলা = ৭০০ nm + ৫৫০ nm
আমাদের ব্রেইনে ৬৫০ nm আলো ঢুকলে যে অনুভূতি হয়, পাশাপাশি একটা ৭০০ nm আর ৫৫০ nm এর আলো ঢুকলেও একই অনুভূতি হয়। আমরা দুটাকেই কমলা মনে করি।
কমলাকে আমরা রংধনুকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু অনেক রঙ আছে যেগুলোকে রংধনুতে পাওয়া যাবে না। যেমন ম্যাজেন্টা। যেমন সাদা আলো।
সাদা আলো তৈরি হয় অনেকগুলো রঙ মিলে। ম্যাজেন্টাও সেরকম, অনেক রঙ মিলে তৈরি।
তার মানে, রংধনুতে যদিও কোটি কোটি রঙ আছে, এগুলোই সব নয়। এর বাইরেও অনেক রঙ আছে।
একটা রঙ অনেকভাবে তৈরি হতে পারে।
সাদা = বেগুনী + নীল + আসমানি + সবুজ + হলুদ + কমলা + লাল
সাদা = নীল + লাল + সবুজ
কোন রঙ কত পরিমাণে মিশেছে সেটা ম্যাটার করে।
আবার রঙগুলো মিলে মিশে সম্পূর্ণ নতুন রঙ তৈরি হতে পারে যেটা আসলে ছিলই না।
তাই যদি হয়, তাহলে লাল নীল সবুজ মৌলিক রঙ আসলো কিভাবে?
উত্তরটা আমাদের চোখে।
৪।
আমাদের চোখের রেটিনায় তিন ধরণের কোণ কোষ আছে।
একগুলো বর্নালিতে লালের দিকের রঙগুলো সেন্স করে বেশি।
খেয়াল করেন। লালের দিকের বলেছি। একটা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নয়।
আরেকগুলো সবুজের দিকের রঙ সেন্স করে। বাকিগুলো নীলের দিকের।
একটু আগে কমলার কথা বলেছিলাম মনে আছে?
চোখের কাছাকাছি দুইটা কোন কোষ যদি একটা লাল একটা সবুজ দেখে ব্রেইন সেটাকে কমলা ধরে।
আবার বিশুদ্ধ কমলা দিলেও ব্রেইন সেটাকে কমলাই ধরে।
একেবারে কি সেইম রঙ ধরে?
নাও হতে পারে। কাছাকাছি হতে পারে।
শুধু কমলা নয়, অন্য বেশিরভাগ রঙ এভাবে নিশুদ্ধ লাল নীল সবুজের নানান কম্বিনেশন মিলিয়ে তৈরি করা যায়।
মনিটর এভাবে কাজ করে।
মনিটরে পাশাপাশি থাকে একটা লাল, একটা নীল, দুইটা সবুজ পিক্সেল।
এগুলো একেকটা একেক উজ্জ্বলতার আলো দেয়।
এগুলো মিক্স হয়ে চোখ নানান রঙ দেখে।
যদি পাশাপাশি দুইটা কোন কোষে ৭০০ ন্যানোমিটারের (লাল) ৩৩ ভাগ ফোটন, আর ৫৫০ ন্যানোমিটারের (সবুজ) ৩৩ ভাগ ভাগ ফোটন ঢুকে আমরা ক্যাটক্যাটা হলুদ রঙ দেখব।
তিনটাই সমান পরিমাণে ঢুকলে দেখব সাদা রঙ।
এইভাবে লাল নীল সবুজ মিশিয়ে অনেক রঙ তৈরি করা যায়। যদিও সব না।
প্রকৃতির হাজার হাজার রঙের মিশ্রণ তাই মনিটরের তিন রঙের ধোঁকাবাজির চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।
তাহলে মৌলিক রঙ আসলে কি?
মৌলিক রঙ আমাদের মানসিক জিনিস। প্রাকৃতিক নয়।
৫।
আর লিখতে মন চাচ্ছে না। কোয়ান্টাম সিরিজের ছ্যারা ভেরা অবস্থা এমনিতেই, তার উপর শ্রোডিঙ্গারের মধ্যে এখন রঙের দুনিয়া ঢুকে পড়েছে।
নিজে ভাবেনঃ
কুকুররা কি রঙ দেখে?
কালার ব্লাইন্ড লোকেরা কি রঙ দেখে?
সবশেষে আরেকটা প্রশ্ন।
আপনার লাল কি আমার লাল? নাকি অন্য কিছু? কিভাবে প্রমাণ করবেন?
চিন্তা করতে হবে।
চক্ষু থাকিতে অন্ধ যেজন আলোকের দুনিয়ায়
সিন্ধু সেচিয়া বিষ পায় সে, অমৃত নাহি পায়!
