পুকুর
(কল্পবিজ্ঞান)
১।
“স্যার, খোদার কসম লাগে, সত্যি কইতাসি। হাত দুইটা সত্যি দেখা যায় স্যার, একবারে সন্ধ্যার সময়। মিশমিশা কালো দুইটা হাত, মনে হয় আপনাকে ডাকতেসে। আপনার পায়ে পড়ি স্যার, মাপ করেন, ওই পুকুরে আমি নামতে পারবো না। ”

আলতাফ সাহেব বিরক্ত হলেন। ছেলেটাকে আনার পর থেকে ধানাই পানাই করছে। কোন কাজ করতে বললেই এই এক্সকিউজ, ওই এক্সকিউজ শুরু হয়। সেদিন মেম্বার মিটিং থেকে ফিরে ঘড়িটা কোথায় যেন রেখেছেন, এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না। ১২ লাখ টাকা দামের রোলেক্স ঘড়ি, হারামজাদাকে দশবার বেচলেও তো দাম উঠবে না। খালি কোনভাবে প্রমাণ করতে পারলে হয়, এমন শিক্ষা দেওয়া হবে যাতে নিজের নাম পালটে আনোয়ার থেকে জানোয়ার করতে মন চায়।
এখন বলছে পুকুরে নামতে পারবে না। ওই পুকুরে নাকি সন্ধ্যার দিকে কি দেখা যায়। কচুরিপানায় ভরা একটা দিঘি, ভেবেছিলেন এইবার বর্ষার আগে আগে পরিষ্কার করিয়ে পুঁটি মাছের পোনা ছাড়বেন। কাজে ফাকি দেওয়ার ধান্ধা কত প্রকার ও কি কি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
আলতাফ সাহেব মনে মনে প্ল্যান আঁটলেন। কালকে সকালে শহরে যেতে হবে, এম পি স্যারের দাওয়াত। এম পি স্যার ওনাকে খুব খাতির করেন মাশাআল্লাহ। তিন দিন পর বাড়ি ফিরলেই দুইটা কাজ করতে হবে।
১। রোলেক্স ঘড়িটা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হবে।
২। আনোয়ারের ব্যাবস্থা করতে হবে।
২।
আলতাফ সাহেব তিন দিন শহরে কাটানোর সুযোগ পেলেন না। বাড়ি থেকে ফোন পেয়ে পরদিন সকালেই তাকে বাসায় ফিরতে হলো।
আনোয়ার মারা গেছে।
বিকাল থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। সাড়ারাত লাপাত্তা। পরদিন ফজরের নামাজের সময় ইমাম সাহেব পুকুরের পার দিয়ে যাওয়ার সময় পুকুরের মাঝ বরাবর দুইটা হাত ভেসে উঠতে দেখে সবাইকে জানান।
পুলিশি তদন্ত হচ্ছে। লাশের অবস্থা ভালো না। ওসির ধারনা কালকে বিকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে কোন এক সময় আনোয়ার পানিতে ঝাঁপ দেয়। অথবা কেউ তাকে মেরে লাশটা পানিতে ফেলে দেয়।
আলতাফ সাহেবের মনটা বিষিয়ে উঠলো। পুলিশ মার্ডার কেসের ধান্ধা করছে। অনেক টাকার ধাক্কা। হারামজাদা মরেও শান্তি দিলো না।
৩।
তিন চারদিন পর সমস্ত ঝামেলা মিটিয়ে আলতাফ সাহেব বাসায় ফিরছেন। সাথে বিরাট বড় একটা ইলিশ মাছ। আজকে অনেকদিন পর শান্তিমতন ভাত খাবেন।
পুকুরের পার দিয়ে হাঁটছেন, হথাত চোখের কোন দিয়ে কি জানি একটা দেখলেন। মাঝখানে দুইটা হাত দেখা গেল না? ঠিক কালো তো না, কেমন জানি ফর্সা। হাতে কি একটা চকচকা ঘড়ি ঝিলিক মারল?
আলতাফ সাহেব আবার তাকালেন। নাহ, মনের ভুল। সব ঠিক আছে।
৪।
শান্তিমত ভাত খাচ্ছেন, কে যেন পেছন থেকে এসে তার চোখ চেপে ধরল। আলতাফ সাহেব আঁতকে উঠলেন।
সাথে সাথে হাতগুলো তাকে ছেড়ে দিলো।
কেউ না, তাঁর মেয়ে টুনু পাশে দাড়িয়ে আছে। আজকে হয়তো স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে। আলতাফ সাহেব লজ্জা পেয়ে গেলেন।
টুনু কাঁচুমাচু করে বলল, সরি বাবা, তুমি এত ভয় পাবে জানলে এই কাজ করতাম না। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। আজকে মা ঘর পরিষ্কার করার সময় খাটের নিচ থেকে ঘড়িটা পেয়েছে। ভেবেছিলাম চোখ বন্ধ করে তোমার হাতে ঘড়িটা পরিয়ে দিবো।
আলতাফ সাহেব তাকালেন। মেয়েটা দেখতে দেখতে অনেক বড় হয়েছে। কি সুন্দর লাগছে!
তার হাতে চকচক করছে দামি একটা রোলেক্স ঘড়ি।