কোয়ান্টাম ৭
১ ।
দিন ১ঃ
নিলস বোর অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন। তাঁর সামনে আশ্চর্য এক বাক্স। পুরু টাইটেনিয়ামের দেয়াল। পুরু শেকল দিয়ে আগাগোড়া মোড়ানো। মস্ত এক তালা ঝুলছে ওই বাক্সের সামনে।
সাতদিন আগে অজানা ঠিকানা থেকে ডাকযোগে বাক্সটা পাঠানো হয়েছে। আজকে অনেক চেষ্টার পর বাক্সটা খোলা হয়েছে। বোর তাকিয়ে আছেন বাক্সের দিকে নয়, ওই বাক্স থেকে যে জিনিসটা বেরিয়েছে সেটার দিকে।
এই মুহূর্তে জিনিসটা থরথর করে কাঁপছে। আকার আকৃতি ঠিক বোঝার কোন উপায় নেই, এতো কাঁপছে। কি দিয়ে তৈরি বোঝা যাচ্ছে না। সলিড হতে পারে, থকথকে জেলি টাইপেরও হতে পারে । এক ধরনের আলো বিদ্যুতের মতো ঝিলিক মারছে তার গা থেকে।
বোর কাপাকাপা হাতে জিনিসটাকে ধরার চেষ্টা করলেন। ছুঁতে পারলেন না। মনে হলো, বাতাসের একটা শক্ত আবরণ জিনিসটাকে ঘিরে রেখেছে, ওই আবরণ ভেদ করে তাকে ধরা যায় না।
দিন ২ঃ
আজকে একটা পরীক্ষা করা হয়েছে। জিনিসটাকে শক্ত করে চেপে ধরে তার আকার আকৃতি নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। খুব একটা লাভ হয় নি। চেপে ধরাতে কাঁপুনি কমেছে, কাঁপুনি কমে যাওয়ার পর তার শেপ আরও অস্পষ্ট হয়েছে।
শেপ যতটুকু বোঝা যায় তাতে আরেকটা উদ্ভট জিনিস ধরা পরেছে। জিনিসটাকে সামনে নিয়ে একবার ঘুরালে তার চেহারা চেঞ্জ হয়ে যায়। পুরো দুই পাক অর্থাৎ ৭২০ ডিগ্রি ঘুরালে তার আগের চেহারা ফিরে আসে। বোর বেশ অস্বস্তিতে আছেন।
মন্দের ভালো জিনিসটার আজকে একটা নাম দেওয়া হয়েছে। বিটকেল, পাটকেল এসবের সাথে মিলিয়ে তার নাম রাখা হয়েছে পার্টিকেল।
দিন ৩ঃ
এই জিনিস ঠিক মেনে নেওয়া যায় না। কোন লজিকে এগুলো খাটে না। কিন্তু এগুলো হচ্ছে।
আজকে একটা পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল, পারটিকেল ছোড়াছুড়ির পরীক্ষা। পার্টিকেলটাকে ছুড়ে মারা হবে, সামনে দুইটা দরজা থাকবে। ওইপাশে একটা পার্টিকেলটা আছড়ে পড়বে। তার ছবি উঠবে।
এত সব ঝামেলা কেন বলি। পার্টিকেলটাকে ছুড়ে মারলে ওইটা কথায় যায় ঠিক বোঝা যায় না। বন্দুক থেকে গুলির মতো পার্টিকেল বের না হয়ে মনে হয় একদলা মেঘ বের হচ্ছে। ওই মেঘ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মেঘটাকে না থামান পর্যন্ত ওর মধ্যে পার্টিকেল কোথায় আছে দেখার কোন উপায় নেই।
পরীক্ষায় ঝামেলা কমলো না, বরং বাড়ল। দেয়ালের ছবি দেখে মনে হচ্ছে পার্টিকেল একই সাথে দুই দরজা দিয়ে ঢোকে।
এ হতে পারে না। বোর দরজার সামনে করা নজর বসালেন। আজকে পার্টিকেল ব্যাটাকে ধরতে হবে। একই সাথে দুই দরজা দিয়ে যায়? ফাইজলামি নাকি?
নজর বসানোর সাথে সাথে পার্টিকেল ভদ্র হয়ে গেল। সে একেকবার একেক দরজা দিয়ে যায়, কখনোই একই সাথে দুই দরজা নয়!
দিন ৪ঃ
অনেক রাত। একটা শব্দে বোরের ঘুম ভেঙ্গে গেল। তার বিছানার পাশে টেবিলটাতে বসে আছে পার্টিকেলটা। থরথর করে কাঁপছে।
একটু টাইম লাগল সমস্যাটা বুঝতে। পার্টিকেল থাকে টাইটেনিয়ামের বাক্সটাতে তালা দেওয়া অবস্থায়। ওই তালার চাবি শুধু তাঁর কাছে। পার্টিকেল এখানে আসলো কি করে?
বোর বাক্স খুললেন। সব ঠিকঠাক আছে। কেউ তালা খুলে নি। পার্টিকেল্টাও বক্সের ভেতর কাঁপছে, বের হয় নি।
মাথা চুলকাতে চুলকাতে বাক্সে তালা দিয়ে বোর বের হয়ে এলেন। সাড়া দিনের পরিশ্রমে হয়তো ভুল দেখেছেন। বিছানার পাশে টেবিলে পার্টিকেল নেই। সব ঠিকঠাক আছে।
গায়ে কম্বল জড়াবেন, কিসে যেন পা ঠেকল। বিছানার উপর পায়ের কাছে শুয়ে আবারো কাঁপছে পার্টিকেলটা। ওটারও মনে হয় ঠাণ্ডা লেগেছে।

২। বৃদ্ধ নিলস বোর ঘুম থেকে ধরমর করে উঠলেন। তাঁর সাড়া জীবনের প্রতিদ্দন্ধি আইনস্টাইন কিছুদিন আগে মারা গেছেন। তাঁরও যাবার সময় হয়ে এসেছে। তাঁর সাড়া জীবনটাই কেটেছে স্বপ্নের মতো। এতগুলো বছর গেল, এত এত গবেষণা হলো, এখনও কেউ বুঝতে পারলো না পার্টিকেল আসলে কি জিনিস! কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন আসলে কি মিন করে।
বোরের মনে পড়ল সেই ছেলেবেলার কথা। সহজ সরল উজ্জ্বল দিনগুলোর কথা।
আজকের যুগে ছেলেমেয়েরা এই কোচিংএ পড়ে, ওই টিচারের কাছে পড়ে। এই কোচিংএ পড়লে নাকি জিপিএ 5 পাওয়া যাবে, ওইটাতে নাকি বুয়েট নিশ্চিত!
বোরের হাসি আসলো। প্রফেসর রাদারফোর্ডের এগার জন ছাত্র নোবেল প্রাইজ পেয়েছিল। রাদারফোর্ড সাইনবোর্ড টাঙ্গালে কেমন হতো,
“দি রাদারফোর্ড কোচিং সেন্টার। পড়লে নোবেল প্রাইজ পাওয়া যাবে। বিফলে মূল্য ফেরত।”
(চলবে)
ইমামুল হাসান
শেষের কথাটা জোস 😍