কোয়ান্টাম ৬
বিজ্ঞানের ভাষা হলো অঙ্ক। গণিত। গণিতকে বাদ দিয়ে আমরা কোনভাবেই বিজ্ঞানকে বুঝতে পারবো না।
এই পর্বটাতে আমরা কথা বলব গণিত নিয়ে।
পৃথিবী ঘুরে কেন?
কেন মঙ্গল পৃথিবীর চেয়ে ধিরে ঘুরে?
কেন রাদারফোর্ড ভেবেছিলেন ইলেকট্রন পৃথিবীর মতো নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘুরছে?
এগুলো শেষ হলে আমরা শুনব ফিল্ডের গল্প। কিভাবে ফিল্ড জিনিসটাকে কল্পনা করা যায়, ঠিক কেন রাদারফোর্ডের মডেল টিকবে না।
আমরা আপাতত রিলেটিভিটি ভুলে যাব। আমাদের জ্ঞান আপাতত নিউটনের যুগে সীমাবদ্ধ।
পৃথিবী ঘুরে কেন?
অনেক অনেকদিন আগের কথা। সৌরজগতের জন্মের সময়কালের সময়। একেক বালুকণা একেকদিকে যাচ্ছে। একেক পাথর একেকদিকে যাচ্ছে।
পরম গতি বলে কিছু নেই, সব বেগ আপেক্ষিক। মহান বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন আমাদের বলে গেছেন, বাইরের কোন বল না থাকলে সূর্যের চারপাশে একেকজন একেকভাবে চলতে পারবে।
এখানে বাইরের বল আছে। সূর্যের মহাকর্ষ বল। অলরেডি জন্ম হওয়া গ্রহগুলোর মহাকর্ষ বল।
যে বালু এর পাথরগুলো সূর্যের দিকে সরাসরি রওনা দিল তারা সূর্যের টানে সূর্যে পরে যাবে, অথবা পথে অন্য কোন গ্রহ উপগ্রহ তাদের খেয়ে ফেলবে ।
যে বালু এর পাথরগুলো সূর্যের উল্টাদিকে রওনা দিল তারা বেগ খুব বেশি থাকলে সৌরজগত থেকে বের হয়ে যাবে। আর বেগ কম থাকলে সূর্য আবার তাদের ব্যাক করাবে।
বাকিরা তাদের বেগের মান আর দিকের উপর নির্ভর করে কেউ কেউ স্ট্যাবেল কক্ষপথে সূর্যের চারপাশে ঘুরবে, বাকিরা সূর্যে পরে যাবে।
উদাহরণ দেখি।
পৃথিবী সূর্যের চারপাশে মোটামুটি গোল হয়ে ঘুরছে।
ধরলাম পৃথিবী X অক্ষ বরাবর সামনে যাচ্ছে। পৃথিবী একটু আগায়, সূর্য তাকে টেনে কেন্দ্র বরাবর নামায়। গতির দিক চেঞ্জ করে।
পৃথিবী X অক্ষ বরাবর সামান্য একটু আগানোর পর সূর্য তাকে কান ধরে টেনে নামাল। সে এখন X অক্ষের একটু নিচ দিয়ে আগাচ্ছে, পুরোপুরি পৃথিবী X অক্ষ বরাবর না, ধরি, ১০ ডিগ্রি কোনে।
আবার সূর্য কেন্দ্র বরাবর টানবে। আবার পৃথিবীর গতির দিক চেঞ্জ হবে।
এভাবে, বারবার পৃথিবী একটু করে আগাবে, সূর্য একটু করে টেনে নামাবে।
একসময় পৃথিবী সূর্যকে একপাক ঘুরে আসবে।
শুধু স্পর্শক বরাবর গেলেই হবে না, পৃথিবীর বেগ আর সূর্যের টানের মধ্যে খুব ভালও একটা ব্যাল্যান্স থাকতে হবে।
ধরি, পৃথিবীর ভর m .
সূর্যের ভর M .
সূর্যের চারপাশে গোল করে ঘুরলে পৃথিবীর বেগ প্রতি মুহূর্তে থাকে v.
পৃথিবী সূর্যের দূরত্ব R.
মহাকর্ষ ধ্রুবক G .
পৃথিবীর উপর সূর্যের টান Fg = G * M * m / R^2
পৃথিবীর কেন্দ্রমুখী বল Fc = mv2 / R
পৃথিবীর বেগ আর সূর্যের বলের মধ্যে যদি এমন একটা ব্যাল্যান্স থাকে যে Fg = Fc হয়, তাহলেই পৃথিবী পারফেক্ট বৃত্তাকার পথে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরবে।
এত সূক্ষ্ম ব্যাল্যান্স বাস্তবে থাকে না। পৃথিবীর গতিপথ পুরোপুরি বৃত্তাকার না, কিছুটা ডিম্বাকার।
আরও ঝামেলা হলো, সূর্যের টানের চেয়ে পৃথিবীর বেগ সামান্য বেশি। পৃথিবী দিন দিন, অতি ধিরে সূর্য থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। এত ধিরে যে, এক মিটার দুরে সরতে তার ১০ লক্ষ বছরের মতো লাগে।
পৃথিবীর গতিপথ পারফেক্ট না, তবে খুবই স্ট্যাবেল।
যদি v এর মান এর বেশি হতো পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে দুরে চলে যেত। কম হলে, ঘুরতে ঘুরতে সূর্যে পরে যেত।
যেসব গ্রহ উপগ্রহের আদি বেগ পুরোপুরি সূর্যের চারপাশে বৃত্তাকার পথের স্পর্শক বরাবর থাকে, শুধু তারাই পার্ফেক্ট বৃত্তাকার পথে চলতে পারে। এত পার্ফেক্ট পথ সৌরজগতে কারো নেই। যদি পথ পুরোপুরি স্পর্শক বরাবর থাকে, তাহলে গতিপথের সব জায়গায় v এর মান সমান থাকবে। নাহলে, দুরে গেলে v এর মান কমবে, কাছে আসলে বাড়বে। সূর্যের মহাকর্ষ বল কাছে আসলে বারে, দুরে গেলে কমে। সেই বলের জন্যই বেগের কমবেশি হয়।
তারপরও, আমরা আমাদের হিসাবের সুবিধার জন্য বৃত্তাকার পথ ধরে নিব। বৃত্তাকার পথে চললে,
Fg = Fc
G*M*m/R2 = mv2/R
G ধ্রুবক, M ধ্রুবক, দুই পাশ থেকে m কাটা যায়
আমরা পাই, k/R = v2
বা, v = root(k/R)
যদি, বৃত্তাকার পথে ঘুরতে সময় লাগে T , তাহলে
v = 2 * pi * R / T
T = 2 * pi * R / v
= 2 * pi * R * root(R) / root (k)
k , pi , 2 dhrubok. আমরা পাই,
T = k1 * R ^ 3/2
বা, T^2 proporsion to R^3
এইটা কেপলারের তৃতীয় সুত্র। এই সূত্র বলে, আমরা মঙ্গল গ্রহ সূর্য থেকে কত দুরে জানলে, মোটামুটি বলে দিতে পারব, সে কত দিনে সূর্যের চারপাশে ঘুরবে।
আমরা বলতে পারব, বৃহস্পতির ভর কোন ব্যাপার না, সূর্য থেকে কত দুরে শুধু তার উপর নির্ভর করে তার এক বছর কত দিনে হবে।
মহামতি জোহান্স কেপলার নিউটনের জন্মের আগে আকাশের দিকে তাকিয়ে এই সূত্র আবিষ্কার করেন। তিনি গ্র্যাভিটি জানতেন না। G এর মান জানতেন না। ভাবতে অবাক লাগে না কিভাবে একজন আশ্চর্য প্রতিভাবান জ্যোতির্বিদ শুধুমাত্র আকাশের দিকে তাকিয়ে, আর খাতায় গ্রহ নক্ষত্রের ছবি এঁকে এঁকে কি সব রহস্যের সমাধান করে গেছেন?

স্যার আইজ্যাক নিউটন, প্রথম প্রমাণ করেন, যে বল আপেলকে মাটিতে ফেলে, সেই একি বল মঙ্গলকে সূর্যের চারপাশে ঘুরায়। তিনি দেখান কেপলারের সূত্র ঠিক কিভাবে, কেন কাজ করে।
এইজন্যই রাদারফোর্ড, পরে বোর, শেষ পর্যন্ত সমারফিল্ড চিন্তা করেন ইলেকট্রন পরমাণুর চারপাশে গ্রহের মতো ঘুরছে। রাদারফোর্ড আর বোর প্রথমে বলেন ব্রত্তাকার কক্ষপথের কথা, সমারফিল্ড বলেন উপবৃত্তাকার কক্ষপথের কথা।
তাদের কেউ শুরুতে কল্পনাও করতে পারেন নি, ইলেকট্রন আসলে ঘুরে না।
ইলেকট্রন যে কি চিজ, সেটা বুঝতে আমাদের আরও সময় লাগবে।
আপাতত, আগামী পর্বে আমরা দেখব, সব ঠিক থাকার পরও কেন রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল টিকবে না।