কোয়ান্টাম ৩৭: সিমুলেটেড ইউনিভার্স?



কোয়ান্টাম ৩৭

সিমুলেটেড ইউনিভার্স?

(বেলের অসমতা ২)

১।

বক্কর ভাইয়ের ব্যাঙ্ক ডাকাতির প্ল্যানটা ফেইল করেছিলো। বক্করের বন্ধু কক্করের চক্করে পরে বক্কর ভাই আবার জেলে গেলেন।

বক্কর ভাই এই মুহূর্তে জেলে বসে গেইম খেলছেন। প্রায়ই জেলে আসে, সেইজন্য জেলার দয়া করে তার জন্য লো কনফিগারেশনের একটা পিসি কিনে দিয়েছে। ওইখানে বক্কর ভাই GTA 5 ইন্সটল দিয়েছেন একটু আগে।

র‍্যাম কম, গ্রাফিক্স কার্ড স্লো, গেইম বারবার ল্যাগ খাচ্ছে। বক্কর ভাই গাড়ি চালিয়ে এক জায়গায় যাচ্ছেন, আশেপাশের সব একটু করে লোড হচ্ছে।

বক্কর ভাই মেজাজ খারাপ করে পিসিটাকে একটা আছাড় মারলেন। সাথে সাথে গেইম বন্ধ হয়ে গেলো। জেলের চার দেয়ালে বসে বক্কর ভাই এখন উদাস মনে ভাবছেন।

আচ্ছা এমন কি হতে পারে না, পুরা দুনিয়াটাই আসলে ওই গেইমের মতো? আমরা যখন দেখি, হুট করে খুব দ্রুত চারপাশের জগতটা লোড হয়? আগে থেকে কোন কিছু রেডি থাকে না?

এমন কি হতে পারে, আমরা সিমুলেটেড ইউনিভার্সে বাস করি? আশেপাশে যা দেখছি সবকিছুই আসলে কোন উন্নত কম্পিউটারে তৈরি গেইম, আমরা জাস্ট ওই গেইমের একেকটা ক্যারেক্টার?


২।

এইবার একটু ফোটনের গল্প বলি।

ফোটনের দুইটা পোলারাইজেশন। হরাইজন্ট্যাল (H) আর ভার্টিক্যাল (V).

সহজ করে বললে, ফোটন বেচারা দুইটা স্টেটে থাকে শুধু। দাড়িয়ে থাকে, অথবা শুয়ে থাকে।

নরম্যালি, একটা লাইট বিমে সব ধরণের ফোটন মিলেমিশে থাকে। কেউ দাড়িয়ে থাকে, কেউ শুয়ে থাকে, বিচ্ছিরি অবস্থা।

কোন অক্ষের সাপেক্ষে?

উত্তর হলো, যেকোনো অক্ষের সাপেক্ষে।

আপনি যদি একটা আনপোলারাইজড লাইট বিমের ফোটনগুলোকে মাপেন, অর্ধেক দেখবেন শুয়ে আছে, অর্ধেক দেখবেন দাড়িয়ে আছে।

ফোটনের সামনে কোন একটা ফিল্টার ধরলে, সে যদি ওই ফিল্টারের সাপেক্ষে শুয়ে থাকে, হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে যাবে। আর যদি দাড়িয়ে থাকে, বের হতে পারবে না। ফিল্টারকে আমরা এভাবে চিন্তা করতে পারি, অনেকগুলো লোহার বার পরপর বসানো আছে, হামাগুড়ি না দিলে বের হতে পারবেন না।

আমরা ফোটনগুলোর সামনে X অক্ষ বরাবর একটা ফিল্টার ধরলাম। এই ফিল্টারের লোহার রডগুলো হরাইজন্ট্যালি সাজানো। শুধু হামাগুড়ি দিয়েই এই ফিল্টার পার হওয়া যাবে। ৫০% ফোটন দেখা যাবে X অক্ষের সাপেক্ষে শুয়ে আছে, তারা ফিল্টার দিয়ে বের হয়ে যাবে। বাকি ৫০% শোষিত হয়ে যাবে।

প্রথম ফিল্টারের আমরা নাম দিলাম আবুল ফিল্টার।


এবার মনে করি, ওই ফিল্টারের সামনে আরেকটা ফিল্টার ধরি Y অক্ষ বরাবর। নাম দিলাম আবুল ফিল্টার। এই ফিল্টারের বারগুলো জেলখানার মতো খাড়া খাড়া। যে অর্ধেক ফোটন আবুল ফিল্টার দিয়ে বের হয়ে এসেছিল তারা তো সবাই X অক্ষের সাপেক্ষে শুয়ে আছে, তার মানে, Y  অক্ষের সাপেক্ষে দাড়িয়ে আছে।

তাহলে, আবুল ফিল্টারের পর বাবুল ফিল্টার লাগালে একটা ফোটনও যেতে পারবে না। সহজ জিনিস।


৩।

এইবার ধরেন, আবুল আর বাবুলের মাঝখানে একটা হাবুল ফিল্টার বসালাম, X অক্ষের সাথে ৪৫ ডিগ্রি কোনে।

তাহলে এখন আছে তিনটা ফিল্টার। আবুল, হাবুল আর বাবুল।

এইবার কি হবে?

দুইটা ফিল্টার দিয়ে তো একটা ফোটনও যেতে পারতো না, তিনটা ফিল্টার হলে কি হবে?

উত্তর হচ্ছে, এইবার কিছু ফোটন তিনটা ফিল্টার দিয়েই যাবে, আবার নতুন করে ওই মাথায় আলো দেখা যাবে।

কিভাবে সম্ভব??

আবুল ফিল্টার দিয়ে যারা যাবে, তারা সবাই মেঝেতে শুয়ে আছে, অর্থাৎ X অক্ষের সাপেক্ষে H অবস্থানে আছে।

X অক্ষের 45 ডিগ্রির সাপেক্ষে সে কোন পজিশনে আছে? শুয়ে নাকি দাঁড়িয়ে?

বলা যায় না, অর্ধেক শুয়ে, অর্ধেক দাঁড়িয়ে?

একটা ফোটন তো অর্ধেক শুয়ে, অর্ধেক দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তাহলে কি হবে?

এইবার যেটা হবে, X অক্ষের সাপেক্ষে যারা শুয়ে ছিল, আর আবুল ফিল্টার দিয়ে গেছে, তাদের অর্ধেক (অর্থাৎ শুরুর ফোটনের ১/৪) হাবুল ফিল্টার দিয়েও যাবে।

কোন অর্ধেক বলতে পারছি না, র‍্যান্ডম ভাবে অর্ধেক যাবে।

এইবার তিন নম্বর ফিল্টার অর্থাৎ বাবুল ফিল্টারের কথা চিন্তা করেন। এই ফিল্টার আছে দুই নাম্বার ফিল্টারের সাপেক্ষে ৪৫ ডিগ্রি কোনে। কিন্তু, দুই নাম্বার দিয়ে যারা বের হয়েছে, তাদের তো এক জনেরও বাবুল ফিল্টার পার করার কথা না। তারা তো সবাই মাটিতে শুয়ে আছে।

কিন্তু, আসলে দেখা যাবে, যেসব ফোটন হাবুল ফিল্টার দিয়ে গিয়েছে, তাদের অর্ধেক আবার বাবুল ফিল্টার দিয়ে যাবে। কিভাবে?

এটা সম্ভব হতে পারে, যদি ৪৫ ডিগ্রি ফিল্টার দিয়ে যখন ফোটন যায়, ওই ফিল্টার মাটিতে শুয়ে থাকা  অর্ধেক ফোটনকে ৪৫ ডিগ্রিতে ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। আবার, বাবুল অর্থাৎ Y অক্ষ বরাবর ফিল্টারটা, ৪৫ ডিগ্রি দিয়ে আসা অর্ধেক ফোটনকে ধরে সোজা দাড় করিয়ে দেয়।

সোজা কথা, ফিল্টার ঠিক করে দেয় কে যাবে কে থাকবে।

৪।

এটা কি কোনভাবে সম্ভব, একেবারে প্রথমবার ফোটন যখন আবুল ফিল্টার দিয়ে যায়, তখনও সে জানতো না সে আসলে দাঁড়িয়ে আছে নাকি শুয়ে আছে। ফিল্টার দিয়ে মাপার পর দেখা যায় কিছু ফোটন দাঁড়িয়ে আছে, কিছু শুয়ে আছে?

এই জিনিস আমরা বুঝবো, যদি দেখি ফোটনগুলো বেলের অসমতা মানছে না।

এই পরীক্ষার জন্য আমাদের লাগবে আরও ভালো জাতের ফিল্টার।

আগের ফিল্টারগুলোতে যেইসব ফোটন যেতে পারতো না সেগুলো শোষণ হয়ে যেত। এইবার সেগুলো প্রতিফলিত হবে, যাতে সেগুলোকেও কাজে লাগানো যায়।

এই নতুন আবুল বাবুল আর হাবুলকে আমরা রাখব ৬০ ডিগ্রি পরপর। আবুল আর হাবুলের মাঝখানের কোণ ৬০ ডিগ্রি, হাবুল আর বাবুলের মাঝখানের কোণ ৬০ ডিগ্রি।

আবুল আর বাবুলের মাঝখানের কোন হচ্ছে তাহলে ১২০ ডিগ্রি।

আবুল দিয়ে যারা যাবে তাদের ১/৪ যাবে বাবুল দিয়ে। কারণ আবুল বাবুলের মধ্যে কোণ বেড়ে হয়েছে ৬০ ডিগ্রি। (হিসাবটা আসলে আসে cos2 theta থেকে, বিস্তারিত আমার বইয়ে থাকবে। cos2 60 = ১/৪)।

সেক্ষেত্রে, আবুল দিয়ে যারা যাবে না, তাদের ৩/৪ যাবে বাবুল দিয়ে। তার মানে হচ্ছে, আবুল দিয়ে যারা যাবে না, তাদের ১/৪ যাবে না বাবুল দিয়ে।

আমরা পাই,

আমরা পাই

p(Abul = Babul) = ১/৪

একই ভাবে,

p(Babul = Habul) =  ১/৪

p(Habul = Abul) = ১/৪

তিনটা যোগ করে পাই,

p(Abul = Babul)  + p(Babul= Habul) + p(Habul= Abul)  = ৩/৪ < ১

আবারও বেলের অসমতা মিথ্যা হয়ে গেছে। এর মানে গত পর্বে বলেছি, মনে আছে?

এর মানে হচ্ছে, ফোটনের মধ্যে গোপন কিছু নেই। যখন তাকে মাপা হবে, তখন সে ঠিক করবে কি বলবে।

আপনি যখন আবুলকে জিজ্ঞাসা করবেন সে ফোটনকে কিভাবে মেপেছে, সে আর ফোটন মিলে কোন একটা পরামর্শ করে আপনাকে জানাবে।

মাপার আগ পর্যন্ত ফোটন কোথায় ছিল বলার কোন অর্থ নেই।

মাপার আগে, ফোটনের কোন ডিরেকশন ছিল না। সে শুয়েও ছিল না, দাঁড়িয়েও ছিল না।

আমরা মেপেছি, ফোটন কোন একটা অবস্থায় এসেছে।

৫।

তাহলে কি প্রমাণ হয়ে গেলো আমরা আসলে সিমুলেটেড ইউনিভার্সে বাস করি?

উত্তর হলো, খুবি সম্ভব।

তবে, এটা একমাত্র ব্যাখ্যা না। আরও ব্যাখ্যা আছে।

প্রিয় পাঠক, আমি কথা দিতে পারি, বাকি ব্যাখ্যাগুলোও অন্য কোন অংশে কম ভয়ানক না।

সাথে থাকুন।

(চলবে)

One thought on “কোয়ান্টাম ৩৭: সিমুলেটেড ইউনিভার্স?”

Leave a Reply