কোয়ান্টাম ১৯
কণা আর তরঙ্গ
(এইটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এইটা না বুঝলে পুরা সিরিজ বৃথা। এর আগে কোয়ান্টাম ১০ পড়ে আসতে হবে। https://www.facebook.com/nayeem.h.faruque/posts/10218838399499222
)
ডি ব্রগ্লির ডায়রি থেকে (কাল্পনিক)
১।
অনেকদিন ধরেই মাথায় সন্দেহটা ঘুরঘুর করছিলো। আইনস্টাইনকে কয়েকদিন আগে সন্দেহটার কথা জানিয়েছিলাম। আইনস্টাইন বলেছিল, এটা সম্ভব। আইনস্টাইনের সাড়া পেয়ে কাজে লেগে গেলাম।
খুব সিম্পল একটা পরীক্ষা। দুইটা চিকন দরজা থাকবে, ওইপাশে একটা দেওয়াল থাকবে। দুই দরজার মাঝ বরাবর একটা বন্দুক থাকবে। বন্দুক থেকে গুলির মতো কণা বের হবে। একেকবার একেকটা দরজা দিয়ে কণা ঢুকবে। ওইপাশের দেওয়ালে কণাগুলোর ছবি উঠবে।
খুব সাধারণ পরীক্ষা। এই সাধারণ পরীক্ষাটা আজ থেকে ২০০ বছর আগে দুনিয়ার ইতিহাস একবার চেঞ্জ করেছিল। আরেকবার কি পারবে?

২।
যা ভেবেছিলাম তাই। অন্য কোনভাবে হিসাব মেলানো সম্ভব না। চোখের সামনে দেখছি, তাও বিশ্বাস হতে চায় না।
ইলেকট্রনকে দরজা বরাবর ছুঁড়ে মারলে কি হওয়া উচিত? বন্দুক আছে দুই দরজার মাঝখানে।
ডানের দরজা দিয়ে ইলেকট্রন ঢুকলে আরও ডানে যাবে।
দেওয়ালে বাউন্স করলে আরও কিছুদূর ডানে যাবে।
ঠিক?
বামের দরজা দিয়ে ঢুকলেও একই কথা।
ইলেকট্রন থাকবে ডানের দরজার ডানে আর বামের দরজার বামে।
মাঝখানটা থাকবে ফাঁকা।

মাঝখানটা ফাঁকা নেই। ওইখানে সবচেয়ে বেশি ইলেকট্রন এসেছে।
একটু করে ইলেকট্রন গেছে দেওয়ালে একটু করে ছবি উঠেছে।
প্রথমে র্যান্ডম ইলেকট্রন। এখানে একটা ওখানে একটা।
কয়েক মিনিট চলার পর দেওয়ালে চমৎকার একটা ছবি ফুটে উঠেছে। ঢেউয়ের ছবি।
ঢেউয়ের মাঝবিন্দু গুলোতে ইলেকট্রন সবচেয়ে বেশি। দুই সাইডে একদম কম। ঠিক যেন পানির ঢেউ।

ফোটাগুলো দেখে মনে হচ্ছে ইলেকট্রন একটা কণা।
এদিকে কণাগুলো যোগ হয়ে ফুটে উঠেছে এক ঢেউয়ের ছবি।
ক্লিয়ার ইন্টারফিয়ারেন্স প্যাটার্ন।

আমি ঘুমাতে গেলাম এক রাশ অস্বস্তি নিয়ে।
৩।
অদ্ভুত এক স্বপ্ন।
স্বপ্নে আমি ডি ব্রগ্লি নই, আমার নাম লুই ডেকেইনি। কুখ্যাত ফরাসি জলদস্যু। আমার নামে থরথর করে কাঁপে আশেপাশের লোকজন।
আজকে আবহাওয়াটা ভাল। পতপত করে বাতাস হচ্ছে, ছোট ছোট ঢেউ উঠছে।
বাতাসে টাকার গন্ধ।
সকালে দুইটা ফিশিং বোট ধরা পরেছে। মাছ, টাকা সব উঠে এসেছে জাহাজে। মাঝির লাশ সমুদ্রে ভেসে গেছে।
সন্ধ্যার আগে আগে আরেকটা নৌকা ধরা পড়ল। বুড়ো মাঝি অনেকবার আকুতি মিনতি করেছিল, ছাড়ি নাই। পরে টের পেয়েছি। হারামজাদার সাথে মোহর ছিল, ১০০টা গ্যালিওন।
সব নিয়ে নৌকাটা ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। হারামজাদার লাশ ভেসে গেছে সমুদ্রে।
ঝামেলার শুরু তার পর থেকে।
পরদিন ভোরবেলা ঝর উঠল, প্রচণ্ড ঝর। বিরাট বিরাট ঢেউ ফুলে ফুলে উঠল। সবাই জাহাজ ঠিক রাখতে ব্যাস্ত, সারেং পাশ থেকে এসে বলল, স্যার দেখেন, ঢেউয়ের আগায় নৌকা।
দেখলাম।
কালকে ডুবিয়ে দেওয়া নৌকাটা আবার ভেসে উঠেছে। দূরের বিরাট ঢেউটার উপর।
একটা নৌকা নয়। ওই নৌকার অনেকগুলো কপি তইরি হয়েছে। ঢেউয়ের আগায় হাজার হাজার নৌকা।
আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখলাম এক অপার্থিব নাটক। একটু পর ঢেউ নেমে গেল। সাথে সাথে সব নৌকা গায়েব। আবার ঢেউ উঠল। জন্ম হলো ঢেউয়ের আগায় নৌকা।
হাজার হাজার নৌকা।
সারেঙকে বললাম গুলি করতে। একসাথে ২০টা কামান থেকে ২০টা গুলি ছুটে গেল ২০টা নৌকার দিকে।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম গুলি লাগার পর নৌকা একটা হয়ে গেছে।
হাজার হাজার কপি সব গায়েব।
ঢেউয়ের আগায় একটা মাত্র নৌকা।
৪।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ডি ব্রগ্লি ডায়রিতে কয়েকটা পয়েন্ট লিখলেন। এই লাইনগুলো ক্লিয়ারলি বুঝতে হবে।
$ ইলেকট্রন গান থেকে বের হয় ইলেকট্রনের ঢেউ। এই ঢেউগুলো দুই ভাগে ভাগ হয়ে দুই দরজা দিয়ে যায়। তারপর নিজেদের মধ্যে ইন্টারফিয়ার করে।
$ ঢেউয়ের মধ্যে ইলেকট্রন কোথায় থাকে কেউ বলতে পারে না। এদের আচরণ দেখে মনে হয় এরা একই সাথে সব জায়গায় থাকে। শুধু শূন্য উচ্চতার জায়গাগুলো বাদে।
$ কেউ যখন দেখতে যায় তখন ঢেউ থেকে ইলেকট্রনের ‘জন্ম’ হয়।
$ যেই জায়গায় ঢেউয়ের উচ্চতা শুন্য সেখানে কোন ইলেকট্রনের জন্ম হয় না। যেখানে ঢেউয়ের উচ্চতা যত বেশি সেখানে ইলেকট্রনের জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।
$ সমুদ্রে তো অনেকগুলো ঢেউ থাকে, একেকটা ঢেউ অনেক জায়গাজুরে থাকে, ঢেউয়ের ঠিক কোন জায়গাটায় ইলেকট্রনকে পাবো? উত্তর হলো, উচ্চতা একই হলে ধরে নেওয়া হয়, ওই সবগুলো জায়গায় ইলেকট্রনকে পাওয়ার সমান সম্ভাবনা। ঠিক কোন জায়গাটায় তাকে পাওয়া যাবে কেউ জানে না।
$ ইন্টারফিয়ার করলে ঢেউগুলো যোগ বা বিয়োগ হয়। যোগ-বিয়োগ হয়ে যেখানে ঢেউয়ের উচ্চতা বারে সেখানে ইলেকট্রনের জন্ম হবে বেশি বেশি। উচ্চতা শূন্য হয়ে গেলে কোন ইলেকট্রন হবে না।

(চলবে)