কোয়ান্টাম ৫১: এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট ২



কোয়ান্টাম ৫১ 

এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট ২ 


vai By Susmit Islam

১। 

বক্কর ভাইয়ের গার্ল ফ্রেন্ডের নাম লক্কড়। 

আধুনিক বাংলা নাম। 

বাড়ি তার লুব্ধক নক্ষত্রের কাছাকাছি একটা গ্রহে। সেখানে এরকম নামই চলে। 

কয়েকদিন আগে বক্করভাই লুব্ধকের ওদিকে গিয়েছিলো, ফেরার সময় লক্কর আপু তাকে এক বাক্স কয়েন গিফট করে। বক্কর ভাই টাকা পয়সাকে অন্য সবকিছুর চেয়ে ভালবাসে বেশি, তাই কয়েন গিফট।  তাছাড়া কয়েন গুলো নাকি কোয়ান্টাম কয়েন, অনেক রেয়ার, দামও অনেক। 

ফেরার সময় লক্কড় আপু ছলছল চোখে বললো, এই কয়েন গুলো খুব স্পেশাল। এগুলো একজোড়া করে আছে। জোড়ার একটা কয়েন আমার কাছে আছে, আরেকটা তোমাকে দিলাম। প্রথম কয়েনটার নাম আবুল, এর জোড়ার নাম আবুলি। দুই নাম্বারটার নাম বাবুল। জোড়াটার নাম বাবুলি। তোমাকে দিলাম আবুল বাবুলদের বক্স। আমার কাছে রাখলাম আবুলি বাবুলিদের বক্স। 

বক্কর ভাই (মনে মনে): আরেকটা বক্স আছে? গুড। নেক্সট টাইম। 

বক্কর ভাই (জোড়ে জোড়ে): বাহ! কি অপরূপ নাম। ঠিক যেন পল ডিরাকের কবিতা!! 

আপু: সবগুলো কয়েন এখন খাড়া হয়ে আছে। তুমি পৃথিবীতে যাওয়ার পর আমি আমার বক্স খুলব, একেকটা কয়েন একেক দিকে পড়বে। কোনটা হেড হবে, কোনটা টেইল। আগে থেকে কেউ জানে না কি হবে। মজার ব্যাপার কি জানো? আবুল যদি হেড হয় আবুলি হবে টেইল। বাবুলি যদি টেইল হয় বাবুল হবে হেড। একটা আরেকটার উল্টা। 

কিন্তু এখন খোলা যাবে না। আমি টাইম লক করে রেখেছি। পৃথিবীতে যাওয়ার পর খুলবে। 

বক্কর ভাই (মনে মনে): ন্যাকা। আমাকে আসছে সাইন্স শেখাতে। 

বক্কর ভাই (জোড়ে জোড়ে): বাহ! অপূর্ব! তোমার কথা শুনলে মনে হয় মাহফুজুর রহমান স্যারের গান শুনছি। 

আপু একটু চোখ সরু সরু করে বলল, কারা এরা? 

বক্কর ভাই বলল, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি আর গায়ক! 

আপুর চোখ ছলছল করে উঠলো। বক্কর ভাইয়ের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। দুইজনে একে অপরের থেকে বিদায় নিলো। 

Credit: Tanvir Rana Rabby

২। 

দুনিয়াতে ফিরে বক্কর ভাই বাক্স খুলে দেখলো, আবুল জাবুল আর নাবুল মাথা উঁচু করে আছে। হেড দেখাচ্ছে। আর বাবুল, কাবুল আর হাবুল লেজ দেখাচ্ছে। 

বক্কর ভাই নোট ডাউন করে রাখল নামগুলো। ন্যাকাটাকে বলতে হবে। 

পরে লক্কড় আপুর সাথে দেখা হলে ঠিকই দেখা গেলো, আবুলই জাবুলি আর নাবুলি আসলেই লেজ দেখাচ্ছে। আর বাবুলি কাবুলি আর হাবুলি মাথা উঁচু করে আছে। 

লক্ষড় আপু তো আনন্দে আত্মহারা। বলেছিলাম না, সবগুলো কয়েন আগে খাড়া হয়ে ছিল। আমি বাক্স খুলেছি, আমার কয়েন সেট হয়ে গেছে। একই সাথে তোমার কয়েনও সেট হয়ে গেছে। সেই না? 

বক্কর ভাই (মনে মনে): ফাইজলামীর একটা সীমা থাকা উচিৎ। আগে থেকে কয়েন সেট করে রেখেছে, এখন বড় বড় কথা! 

বক্কর ভাই (জোড়ে জোড়ে): অসাধারণ জিনিস। চরম আবিষ্কার! সাকিব খান ফেইল। উনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। 

আপু: হুম। এইটাই সাইন্স। 

৩। 

বুঝাই যাচ্ছে আপু বক্কর ভাইকে কনভিন্স করতে পারে নি। বক্কর ভাইকে কনভিন্স করতে হলে আপুকে আরও অনেক কিছু করতে হতো। 

চলুন ঘুড়ে আসি কয়েনের দুনিয়া থেকে। 


কয়েন টসে হেড ওঠার প্রোবাবিলিটি 1/2। টেইল ওঠারও তাই। 

আপনার কাছে যদি এক লক্ষ কয়েন থাকে, সেগুলো টস করলে হেড উঠবে মোটামুটি ৫০,০০০ টায়। 

এইবার ভাবি, প্রতিটা কয়েনের একটা করে জোড়া আছে। একজোড়া কয়েন টস করলে দুইটারই একই আউটকাম আসার সম্ভাব্যতা কতো? মানে দুইটাতেই হেড অথবা দুইটাতেই টেইল? 

দেখে আসি: চার রকম আউটকাম হচ্ছে HH, HT, TH, TT. দুইটাতেই একই আউটকাম আসার সম্ভাব্যতা তাহলে ২/৪ অর্থাৎ ১/২। 

এখন যদি দেখি, জোড়ার দুইটা কয়েন সব সময় উল্টা আউটকাম দেয় কি বুঝবো? 

– কয়েন গুলো বুদ্ধিমান। এবং কিছুটা আবেগপ্রবণ। তার জোড়া যেই আউটকাম দেয়, সে দেয় তার উল্টোটা। তারা প্রাণের টানে একে অপরের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছে। 

নাকি

– কয়েন গুলো ফালতু। বায়াসড কয়েন। একটা সব সময়ই হেড দেয়, আরেকটা দেয় টেইল।  

আপনি হলে কোনটা ভাবতেন? নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টা? প্রথমটা ভাবার কোন কারণ আছে কি? 

৪। 

এইবার আসেন কয়েন ট্রিপলেটের কথায়। প্রতিটা কয়েন তিনটা করে আছে। 

এক টাকার কয়েন আছে তিনটা। 

দুই টাকার কয়েন আছে তিনটা। 

এরকম। 

ধরি এক টাকার তিনটা কয়েনের নাম এরকমঃ আবুল, বাবুল কাবুল। 

এইবার এই তিনটা কয়েন থেকে যেকোন এক জোড়া যদি নেন, তার পরও এরা সব সময় আউটকাম উলটা দেয়, তাহলে কোন ভাবেই আগে থেকে আউটকাম ঠিক করে রাখা সম্ভব না। 

উদাহরণ দেই। 

আবুলের পর বাবুলকে টস করলে, আবুল হেড দিলে বাবুল অবশ্যই টেইল দিলে। 

এরপর যদি কাবুলকে মাপা হয়, বাবুল টেইল দিয়েছে, তাই কাবুল অবশ্যই হেড দিবে। 

এইবার আবুলকে মাপলে সে টেইল দিতে বাধ্য। কারণ এর আগে কাবুল টেইল দিয়েছে। 

আবুলের পর কাকে মাপবেন? কাবুলকে আবার? নাকি হাবুলকে? 

যাকেই মাপেন না কেন, সে আগের জনের চেয়ে উলটা আউটকাম দিবে! 

এখন আর বলার কোন উপায় নেই আবুল হাবুল কাবুল বায়াসড। তারা অত্যন্ত ভালো, মানবিক মানুষ। সব সময় একে অপরের খোঁজ রাখে। একজন যা করে অন্যজন তার উল্টোটা করে। 

লাস্ট একটা কেইস: পরপর দুইবার আবুলকে টস করলে কি হবে? দুইবার কি একই আউটকাম আসবে? নাকি উল্টা? 

আমাদের এই উদাহরণের জন্য, এক্ষেত্রে আউটকামের কোন নিয়ম নেই। একই কয়েন দুইবার টস করলে একই আউটকাম আসতেও পারে, নাও পারে। 

৫। 

বেলের উপপাদ্য: 

ধরি আমাদের আছে তিনটা কয়েন A, B আর C. 

p(A = B) মানে A আর B পরপর টস করা হয়েছে। A তে যা উঠেছে B তেও তাই উঠেছে। কোন অর্ডারে টস করা হয়েছে ব্যাপার না। 

তাহলে, 

p(A = B) + p(B = C) + p(C = A) >= 1 হবে। 

এর নাম বেলের অসমতা। 

যদি নরমাল কয়েন হয়, তাহলে p(A = B) = 1/2 হবে। বাকিগুলোও সেইম। 

যোগফল হবে 3/2. 

যদি তেড়া ব্যাকা, বায়াসড কয়েন হয় তার পরও যোগফল অন্তত 1 হবে। 

যেমন যদি A সব সময়ই হেড দেয়, B সব সময়ই টেইল দেয়,  C সব সময়ই হেড দেয় তাহলে, 

p(A = B) = 0 হবে। 

p(B = C) = 0 হবে। 

কিন্তু p(C = A) হবে 1. 

যোগ করে আমরা পাবো 1. 

সম্মানিত পাঠক, আপনি যেভাবে খুশি কয়েন বায়াস করতে পারেন। কোনভাবেই এই সম্ভাব্যতার মান একের চেয়ে কম পাবেন না। 

শুধুমাত্র একটা ক্ষেত্রে এটা সম্ভব। যদি আগেরটার আউটকাম জেনে কয়েন চেঞ্জ হয়। ঠিক যেমন আমাদের উদাহরণ টায়। 

এখানে 

p(A = B) = 0.

p(B = C) = 0.

p(C = A) = 0. 

যোগফল এক্ষেত্রে শুন্য। 

বেলের থিওরেম বলে, 

যদি কখনও 

p(A = B) + p(B = C) + p(C = A) < 1 হয় 

তাহলে আগে থেকে কিছুই ঠিক করা নেই। 

আবুল বাবুল কাবুল নিজেদের মধ্যে অবশ্যই যোগাযোগ করেছে। একজনের আউটকাম দেখে অন্যজন সেট হয়ে গেছে। 

৬। 

এইবার আমরা দেখি, কোনভাবে এই কয়েনগুলো ব্যবহার হরে তথ্য পাঠানো সম্ভব কিনা। 

ধরেন লক্কড় আপু নিজের কাছে রাখল আবুল আর বাবুল। 

বক্কর ভাইয়ের হাতে পড়লো কাবুল। 

বক্কর ভাই সকালে উঠে কাবুলকে টস করে দেখলও, সেখানে হেড উঠেছে। 

এর মানে কি লক্কড় আপু একটু আগে টস করে টেইল পেয়েছে? 

নাও হতে পারে। হয়তো বক্কর ভাইইই প্রথম টস করলো, হেড উঠলো। 

বক্কর ভাই দ্বিতীয় টস করলো। এইবারও হেড উঠল। 

কারণ কি হতে পারে? 

হয়তো আপু আবুল বা বাবুলকে টস করে টেইল পেয়েছে। 

হয়তো আপু কিছুই করে নি। বক্কর ভাই জাস্ট পরপর দুইবার কাবুলকে টস করেছে। 

আপু যদি আবুল বা বাবুলকে টস করে টেইল পায় তাহলে অবশ্যই বক্কর ভাই হেড পাবে। কিন্তু বক্কর ভাই হেড পেয়েছে মানেই এই না যে আপু আবুল বা বাবুলকে টস করে টেইল পেয়েছে! 

তার মানে কয়েনগুলো নিজেদের মধ্যে ঠিকই যোগাযোগ করছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে, কিন্তু আমরা এই সিস্টেম ব্যবহার করে তথ্য পাঠাতে পারছি না! 

প্রশ্নঃ কোনভাবে কি সম্ভব সিস্টেমকে বিট করা? কোন একটা নিয়ম ঠিক করা যাতে করে এই জিনিস ব্যবহার করে আলোর বেশি বেগে তথ্য পাঠানো যায়? 

উত্তরঃ সম্ভব। কিভাবে, বলব না। পাঠককে চিন্তা করতে হবে। 


৭। 

লক্কড় আপু সিস্টেম বিট করার উপায় খুঁজে পেয়েছিলো। বক্কর ভাই আর লক্কড় আপু আলোর বেশি বেগে তথ্য পাঠাতে পেরেছিল। 

সিস্টেম বিট করে বক্কর ভাই লক্কড় আপুকে প্রথম যে মেসেজটা পাঠায় সেটা হচ্ছেঃ 

তোমার বুদ্ধি আসলেই আইনস্টাইনের কাছাকাছি। 

আপু জানতে চায়, আইনস্টাইন কে? 

বক্কর ভাই জবাব দেয়, কেউ না, সামান্য এক বেহালা বাদক। 

মেসেজ লিখতে গিয়ে গাল লাল হয়ে যায় তার! 

৮। 

আমরা আমাদের উদাহরণে যে কোয়ান্টাম কয়েন নিয়ে এসেছি সেটাকে হ্যাক করা সম্ভব। সেটা ব্যবহার করে আলোর বেশি বেগে তথ্য পাঠানো যায়। 

প্রকৃতিতে যে কোয়ান্টাম কয়েন আছে সেটা ফুল প্রুফ। 

সেই কয়েন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে ঠিকই, কিন্তু সেটাকে হ্যাক করার কোন উপায় নেই। 

আপনি কখনোই সেই কয়েন ব্যবহার করে আলোর বেশি বেগে তথ্য পাঠাতে পারবেন না। 

প্রকৃতি আইনস্টাইনকে বড় ভালোবাসে, এমন কিছু সে হতে দেবে না যাতে আপেক্ষিক তত্ব ভায়োলেট করে। 

কিন্তু তার পরও, কয়েনগুলো নিজেদের মধ্যে ঠিকই আলোর চেয়ে বেশি বেগে যোগাযোগ করতে পারবে। অনেক পরে দুই পাশের কয়েন মিলিয়ে দেখলে আপনি টের পাবেন এরা যোগাযোগ করেছিলো। কিন্তু এই যোগাযোগ ব্যবহার করে আপনি কোন তথ্য পাঠাতে পারবেন না। 

প্রকৃতি নীলস বোর, হাইজেনবার্গ, ডিরাক, শ্রোডিঙ্গারকেও  অনেক ভালবাসে। এমন কিছু সে হতে দেবে না যাতে কোয়ান্টাম মেকানিক্স মিথ্যা হয়ে যায়। 

আগামী পর্বে আমরা দেখবও সত্যিকারের হ্যাক প্রুফ কোয়ান্টাম কয়েন। 

One thought on “কোয়ান্টাম ৫১: এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট ২”

Leave a Reply