কোয়ান্টাম ২৭
ফাইনম্যানের টাইম মেশিন
১।
টপ ১০ ফিজিসিস্ট লিখে গুগল করেন। আইনস্টাইন, নিউটনের পাশে হাসিখুশি একজন লোকের চেহারা দেখা যাবে, থুতনিতে হাত রেখে মিটিমিটি হাসছেন। তার নাম ফাইনম্যান। কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রডিনামিক্সকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভুল তত্ত্ব, গত ৭০ বছর ধরে সে হাজার হাজার পরীক্ষায় পাশ করে এসেছে। এই থিওরি আলোর সব ধর্মকে ব্যাখ্যা করতে পারে। রিচার্ড ফাইনম্যান এই থিওরির অন্যতম জনক। আজকে একটু ফাইনম্যানকে নিয়ে গল্প লেখি।

ফাইন্ম্যান মুদির দোকানে গেছেন ইলেকট্রন কিনতে। এক হালি ইলেকট্রন ১০০টাকা। দোকানদার বলল, ভাই একটু দেখে শুনে নেন? ওজন ঠিক আছে কিনা, চার্জ স্পিন সব ঠিক আছে কিনা, পরে কম বেশি হলে আমাকে বলতে পারবেন না। একবার বেচা হয়ে গেলে মাল ফেরত নেওয়া হয় না।
ফাইনম্যান খুব ফাইন ম্যান, তিনি বললেন, লাগবেনা ভাই, এই জিনিস ইলেকট্রন হয়ে থাকলে এগুলার ভর চার্জ সব জানা আছে আমার। একটুও কম বেশি হবে না। দোকানদার খুশিই হলো। আর সব কাস্টোমার যদি এতো ফাইন হতো!
ফাইনম্যান অবশ্য বিজ্ঞানী মানুষ। তিনি জানেন, পৃথিবীর প্রতিটা ইলেকট্রন একেবারে এক জিনিস। এক চুল বেশ কম নাই। প্রতিটার ভর হুবহু এক, চার্জ হুবহু এক, সবগুলোর স্পিন ১/২। যেই কোম্পানি এগুলো বানায় সেটা খুব নামকরা কোম্পানি, কোন হিসাবে কম বেশি করে না। পৃথিবীর সব ইলেকট্রন দেখতে একই রকম, এগুলোকে বলে আইডেন্টিক্যাল পার্টিকেল। একই কথা সবগুলো ফোটনের বেলায়ও চলে।
তো ফাইনম্যান ইলেকট্রন কিনে বাসায় যাচ্ছেন, রাস্তায় যেতে যেতে মাথায় প্রশ্ন আসলো, কেন সব ইলেকট্রন একই রকম? একটু তো কম বেশি হতে পারতো? কেন বড় জিনিস কখনও দুইটা একই রকম হয় না, কিন্তু ইলেকট্রনগুলো সব একই রকম?
তাঁর মাথায় তিনটা আইডিয়া আসলো। চলুন মাথার ভিতর একটু উঁকি মেরে দেখি।
আইডিয়া একঃ যেই কোম্পানি ইলেকট্রন বানায় সেটা খুব ভালো কোম্পানি, এরা এদের কাজ বুঝে। শেষ।
তবে ফাইনম্যান বিজ্ঞানী মানুষ তো, এই আইডিয়াটা তাঁর ঠিক পছন্দ হলো না। আরও বেটার আইডিয়া দরকার।
আইডিয়া দুইঃ ইলেকট্রন আসলে স্ট্রিং। শুধু ইলেকট্রন না, ফোটন, কোয়ার্ক, সব আসলে স্ট্রিং। এগুলো আসলে একটাও সত্যিকারের কণা না। একটা তার এগারটা ডাইমেনশনে কাঁপছে। সে কিভাবে, কতো কম্পাঙ্কে, কতো বিস্তারে কাঁপতে পারে তার উপর ভিত্তি করে তার একেক রকম চেহারা প্রকাশ পাচ্ছে। এই স্ট্রিং আবার একেবারে খুশি মতো কাঁপতে পারে না। শুধু নির্দিষ্ট কিছু বিস্তারে, নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে কাঁপতে পারে। ধরেন, সে যদি ৫ বিস্তার আর ১০ কম্পাঙ্ক নিয়ে কাঁপে, আমরা দেখবো ইলেকট্রন। ১০ বিস্তার আর দুই কম্পাঙ্ক নিয়ে কাঁপলে আমরা দেখবো হয়তো কোয়ার্ক।
যাক, একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলো। স্ট্রিং থিওরির কোন প্রমাণ নেই এখন পর্যন্ত, বিপক্ষ লুপ থিওরিও দাড়িয়ে গেছে। এমন হতেও পারে স্ট্রিং থিওরি বাতিল হয়ে যাবে।
আর কি কোন ব্যাখ্যা সম্ভব?
রাতে ভাত খেতে বসেছেন, ইলিশ মাছের ঝোল আর টম্যাটোর সস দিয়ে। তখন তাঁর মাথায় তিন নাম্বার আইডিয়াটা আসলো।
আইডিয়া তিনঃ এই আইডিয়াটার জন্ম আসলে QED নিয়ে কাজ করার সময়। একটা ইলেকট্রনের নিত্যদিনের জীবনে কি কি ঘটনা ঘটতে পারে ফাইনম্যান দেখছিলেন।
ঘটনা একঃ নিরীহ একটা ইলেকট্রন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় একটা ফোটনের সাথে তার দেখা। নিরীহ ইলেকট্রনটা টপ করে ফোটনটাকে গিলে নিয়ে পথ চলতে থাকলো। একটু পর টয়লেটে যেয়ে ফোটনটাকে বের করে দিলো।
ঘটনা দুইঃ নিরীহ একটা ইলেকট্রন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সে কোন ফোটন খাওয়ার আগেই একটা ফোটন ত্যাগ করলো! একটু পর খিদা লাগলে সে একটা ফোটনকে ধরে খেলো।
ঘটনা তিনঃ নিরীহ একটা ইলেকট্রন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সে একটা ফোটনকে ত্যাগ করার পর তার মনে পড়লো সে ফোটনকে খেতে ভুলে গেছে। তাই সে সময়ের উলটা দিকে যেয়ে একটা ফোটনকে খেয়ে আসলো। তারপর আবার সময়ের সোজা দিকে রওনা দিলো।

তিন নাম্বার ঘটনা কি আসলে সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব। আমরা যেহেতু সময়ের উলটা দিকে যাই না, সোজা দিকেই যাই, আমরা দেখি, একটা ইলেকট্রন আর একটা ফোটন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাত করে ফোটনটা ভেঙ্গে আর একটা ইলেকট্রন আর একটা পজিট্রনের জন্ম হলো। আগে ছিল একটা ইলেকট্রন, একটু পর হলো ২টা ইলেকট্রন, একটা পজিট্রন। একটু পর পজিট্রনটা আগের ইলেকট্রনের সাথে মারামারি করে মরল, দুই জনের লাশ থেকে জন্ম হলো আরেকটা ফোটনের। আর আগের ফোটনটা ভেঙ্গে যে ইলেকট্রনের জন্ম হয়েছিলো সে খুশি মনে চলতে থাকলো।
ফাইনম্যান ভাবলেন। একটা পজিট্রন হুবহু ইলেকট্রনের মতো, ভর স্পিন সবই এক, খালি চার্জটা পজিটিভ। একটা পজিট্রন আর সময়ের উলটা দিকে চলা ইলেকট্রনের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই।
তাই যদি হয়, তাহলে,
একটা ইলেকট্রন ছিল। সে সময়ের উলটা দিকে রওনা দিলো। জন্ম হলো একটা ইলেকট্রন একটা পজিট্রনের। পজিট্রন আবার সময়ের সোজা দিকে গেলো। এইবার হলো দুইটা ইলেকট্রন। ওই ইলেকট্রন আবার ব্যাক করলে?
ফাইনম্যানের চোখ চকচক করছে। সব ইলেকট্রন একই রকম কেন তার আরেকটা ভয়াবহ ব্যাখ্যা তিনি পেয়ে গেছেন। ইলেকট্রন আসলে একটা। সবগুলো ইলেকট্রন আসলে ওইটার কপি। সবগুলো ফোটন আসলে একটা ফোটনের কপি।
এই থিওরিও কিন্তু নিখুঁত না। শেষে প্রশ্ন থেকে যায়, ইলেকট্রনের সমান সংখ্যক পজিট্রন থাকার কথা। তারা গেলো কই?

২।
আউডেন্টিক্যাল পার্টিকেল কিন্তু ভয়াবহ জিনিস, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আশ্চর্য খেলাগুলো সব হয় আউডেন্টিক্যাল পার্টিকেলের সাথে। আমরা এতদিন যে তরঙ্গের ইন্টারফিয়ারেন্সের কথা বলে এসেছি, সেটা হয় আইডেন্টিক্যাল পার্টিকেলের সাথে।
একটা ইলেকট্রনের তরঙ্গ কোয়ার্কের তরঙ্গকে চিনেই না। সে মরল কি বাঁচল কেয়ারও করে না।
দুইটা ফোটন একে অন্যকে খুবই ভালবাসে। সব ফোটন একসাথে মিলেমিশে বাস করতে চায়।
দুইটা ইলেকট্রন একে অপরকে ঘৃণা করে। তারা একে অন্যকে বাঁশ মারতে চায়, আর একজন আরেকজনের চেয়ে শতহাত দূরে চলে!
বিস্তারিত, আগামী পর্বে।
শিমুল
রাতে ভাত খেতে বসেছেন, ইলিশ মাছের ঝোল আর টম্যাটোর সস দিয়ে। তখন তাঁর মাথায় তিন নাম্বার আইডিয়াটা আসলো।
আইডিয়া তিনঃ এই আইডিয়াটার জন্ম আসলে QED নিয়ে কাজ করার সময়। একটা ইলেকট্রনের নিত্যদিনের জীবনে কি কি ঘটনা ঘটতে পারে ফাইনম্যান দেখছিলেন।
ঘটনা একঃ নিরীহ একটা ইলেকট্রন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় একটা ফোটনের সাথে তার দেখা। নিরীহ ইলেকট্রনটা টপ করে ফোটনটাকে গিলে নিয়ে পথ চলতে থাকলো। একটু পর টয়লেটে যেয়ে ফোটনটাকে বের করে দিলো।
ঘটনা দুইঃ নিরীহ একটা ইলেকট্রন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সে কোন ফোটন খাওয়ার আগেই একটা ফোটন ত্যাগ করলো! একটু পর খিদা লাগলে সে একটা ফোটনকে ধরে খেলো।
ঘটনা তিনঃ নিরীহ একটা ইলেকট্রন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সে একটা ফোটনকে ত্যাগ করার পর তার মনে পড়লো সে ফোটনকে খেতে ভুলে গেছে। তাই সে সময়ের উলটা দিকে যেয়ে একটা ফোটনকে খেয়ে আসলো। তারপর আবার সময়ের সোজা দিকে রওনা দিলো।
জোস ভাই। শেষের লাইনগুলো দারুণ 👌