কোয়ান্টাম ২৬: নক্ষত্র আর ব্ল্যাক হোল : পলির অপবর্জন নীতি



কোয়ান্টাম ২৬
নক্ষত্র আর ব্ল্যাক হোল : পলির অপবর্জন নীতি

“মহাকাশে নিকষ কালো অন্ধকার, তার মাঝে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। কোথাও নেবুলার রক্তিম ঘূর্ণন, কোথাও ধোঁয়াটে গ্যালাক্সি। কোথাও কোয়াজারের নীল উজ্জ্বল আলো, কোথাও অদৃশ্য ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণে আটকে পরা নক্ষত্রের তীব্র আলোকছটা। সেই আদি নেই, অন্ত নেই অন্ধকার হিম শীতল মহাকাশ দিয়ে ছুটে চলছে ফোবিয়ান।”
-মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১।
টেলিস্কোপের নিচে রাতের আকাশের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সম্ভবত নেবুলা। মাইলের পর মাইল, আলোকবর্ষের পর আলোকবর্ষ জুরে থাকা গ্যাস আর ধুলার মিশ্রণ, ফাঁকে ফাঁকে তার জ্বলজ্বল করছে নক্ষত্রপুঞ্জ। কখনো কখনো দূরের কোন সুপারনোভার বিস্ফোরণের ঢেউ অথবা অন্য কোন কারনে আলোড়িত হয় নেবুলার গ্যাসের মেঘ, নিজেদের গ্রাভিটির টানে এক জায়গায় জড়ো হয়ে ঘুরতে থাকে ধূম্রপুঞ্জ।

Nebula

প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে এমনি এক নেবুলা পুঞ্জিভূত হয়ে আমাদের সৌরজগতের যাত্রা শুরু। মাঝখানে সূর্যে তখনও ফিউশান শুরু হয় নি, সে তখনও ঘূর্ণায়মান গ্যাসের একটা কুন্ডলিমাত্র। সূর্যের এই অবস্থার নাম প্রটোস্টার। তখন নেবুলার গ্যাস আর নানা ধরনের ধাতুর মিশ্রণ সূর্যের আশেপাশে অনেক জায়গায় ছোট ছোট গুচ্ছে গুচ্ছে জড়ো হচ্ছে, এদের মধ্যেই কেউ কেউ হবে ভবিষ্যতের প্ল্যানেট।

প্রটোস্টারের গ্যাস আর ধূলিকণা নিজের গ্রাভিটির চাপে আরও কাছে, আরও কাছে আসে। বাড়তে থাকে চাপ আর তাপমাত্রা। প্রায় ১ লক্ষ বছর ধরে চাপ আর তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে একসময় এমন অবস্থায় আসে যে হাইড্রোজেন নিউকিয়াসগুলো তীব্র ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকর্ষণ উপেক্ষা করে একে অপরের সাথে জোড়া লাগা শুরু হয়। একে ফিউশান বলে।

Protostar

হাইড্রোজেন হাইড্রোজেন জোড়া লেগে হিলিয়াম হওয়া শুরু হলে একটা প্রটোস্টারের নাম হয় মেইন সিকোয়েন্স স্টারঃ মূল ধারার নক্ষত্র। আমাদের সূর্য একটা মাজারি সাইজের, হলুদ বামন টাইপের মেইন সিকোয়েন্স স্টার। সূর্যের ভরের ১০ ভাগের ১ ভাগ থেকে শুরু করে প্রায় ২০০ গুন পর্যন্ত নানা রেঞ্জের মেইন সিকোয়েন্স স্টার আছে। সবচেয়ে বড়গুলো নীল দানব তারা, ছোটগুলো বাদামি বামন ।

আমাদের জুপিটার আর প্রায় ৮০ গুন বড় হলে জুপিটারেও ফিউশান শুরু হয়ে যেত। তখন সৌরজগৎ হতো ২টা তারার একটা বাইনারি সিস্টেম। বেশিরভাগ সৌরজগতের ২ ৩টা সূর্য থাকে, একটা সূর্য বরং রেয়ার।

২।
সূর্য আরও ৬-৭০০ কোটি বছর মেইন সিকোয়েন্স স্টার থাকবে। তারপর একদিন সূর্যের কেন্দ্রের হাইড্রোজেন শেষ হয়ে যাবে। কেন্দ্র চুপসে পড়বে, সাথে নিয়ে আসবে বাইরের লেয়ারের হাইড্রোজেন। একসময় প্রচণ্ড চাপে বাইরের লেয়ারের হাইড্রোজেনে ফিউশান শুরু হবে। মারাত্মক উল্টামুখি চাপে তখন বার্স্ট করবে সূর্য। ধীরে ধীরে বড় হবে সে।

বড় হতে হতে সে বুধ গ্রহকে খেয়ে ফেলবে। তারপর একসময় শুক্রের কক্ষপথ ছাড়িয়ে যাবে। এখনকার চেয়ে ২০০ গুন বড় আর ২০০০ গুন বেশি উজ্জ্বল একটা লাল দানব তারা তখন আকাশে জ্বলজ্বল করবে। ততদিনে পৃথিবীর সব সমুদ্রের পানি শুকিয়ে যাবে, সব জীবন্ত প্রাণী মারা যাবে, সবকিছু পুরে ছারখার হয়ে যাবে।

একসময় ফিউশান হয়ে বাইরের লেয়ারের সব হাইড্রোজেন হিলিয়াম হয়ে যাবে। বাইরের লেয়ারের হাইড্রোজেন শেষ হয়ে যাওয়ার পর সূর্য কিছুদিনের জন্য কল্যাপ্স করবে। এবারের কল্যাপ্সে যে মারাত্মক চাপ আর তাপমাত্রার সৃষ্টি হবে তাতে আগুন ধরবে হিলিয়াম শেলে। ৩টা করে হিলিয়াম পরমাণু ফিউসড হয়ে তৈরি হবে কার্বন। প্রচণ্ড চাপে সূর্য আরেকবার বড় হবে। এইবার পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে যাবে।

পৃথিবীর তখন কি হবে এ নিয়ে ডিবেট আছে। পৃথিবীর কক্ষপথ তখন আরও বেড়ে গিয়ে পৃথিবী বেঁচে যেতে পারে। অথবা সূর্যের পেটের মধ্যে যেয়ে পুরোপুরি ছারখার হয়ে যাবে আজকের মাটির পৃথিবী। শুধু টিকে থাকবে একটা গলিত ধাতুর কোর। পৃথিবীর যাই হোক না কেন, সেটা দেখার জন্য কেউ সেখানে থাকতে পারবে না।

হিলিয়াম ফিউশানের মারাত্মক চাপে একসময় চারপাশে আরও অনেক জায়গা জুরে ছড়িয়ে পড়বে সূর্যের গ্যাস। সূর্য তখন হবে একটা প্ল্যানেটারি নেবুলা, চারপাশে ছড়ানো গ্যাস আর মাঝখানে চুপসে পরা কোর।

তারপর একসময় হিলিয়াম শেষ হবে। সূর্য আবার চুপসে পড়বে। হিলিয়ামে আগুণ ধরানোর জন্য যথেষ্ট বড় সূর্য যায়। এরপর আর নতুন করে ফিউশান হবে না।

বাইরে ছড়িয়ে পড়বে হিলিয়াম গ্যাস, ভেতরে চুপসে পড়ে থাকবে কার্বনের একটা মৃত কোর। নাম তার হোয়াইট ডোয়ার্ফ, সাদা বামন। প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে না পেরে সেখানে কার্বন পরমাণুর আন্তঃআণবিক ফাঁকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সে পরিণত হয়েছে নিউক্লিয়াস আর ইলেকট্রনের সুপে।

পলির অপবর্জন নীতি ফারমিওনগুলোকে এক হতে দেয় না। দুইটার বেশি ইলেকট্রন খুব কাছাকাছি আসতে পারবে না। একে বলে ইলেকট্রন ডিজেরারেসি প্রেশার। এই চাপের জন্য সূর্যের কোর আর ছোট হবে না।

হিলিয়াম শেষ হয়ে যাওয়ার পর সূর্যের শক্তির উৎস শেষ। সে জ্বলজ্বল করবে তার যতটুকু তাপ অবশিষ্ট আছে তাই নিয়ে। বহু, বহু বছর এভাবে আসতে আসতে আলো দিয়ে তার আলো নিভে আসবে। তার নাম হবে তখন ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ।

এককালের সুবিশাল সূর্য এখন পৃথিবীর সমান সাইজের জ্বলজ্বলে একটা ডায়মন্ডের মতো। তার ১ চামচের ওজন ৫ টনের বেশি।

৩।
সূর্যের চেয়ে আরও বড় যেসব নক্ষত্র আছে তাদের কেন্দ্রে হিলিয়াম শেষ হয়ে গেলেও চুপসানো থামবে না। কার্বনে ফিউশান শুরু হয়ে যাবে। একে একে তৈরি হবে লোহা, তামা, সিসা আরও ভারি মৌলগুলো। সে সময় যে অভাবনীয় বিস্ফোরণ হবে তাতে একটা আস্ত গ্যালাক্সির চেয়ে বেশি শক্তি নির্গত হবে। আলোর ১০% বেগে ছড়িয়ে পড়বে লোহা তামা সবকিছু।

এই বিস্ফোরণের নাম সুপারনোভা এক্সপ্লোশান। আমাদের সৌরজগতের সব লোহা, তামা, শিশা কোন এক সুপারনোভা বিস্ফোরণে জন্ম। আশেপাশে ১০০ আলোকবর্ষের মধ্যে কোন সুপারনোভা এক্সপ্লোশান হলে পৃথিবীর জীবজগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। ভাগ্য ভালো এত কাছে কোন সুপারনোভা নেই।

আজ থেকে প্রায় ১০০০ বছর আগে ৬২৩ আলোকবর্ষ দুরের এক সুপারনোভা ২ বছরের জন্য পৃথিবীর আকাশে দেখা যায়। দিনের আলোতেও সেই তারাটা জ্বলজ্বল করত। সেদিনের চাইনিজ পণ্ডিতরা এই তারার নাম দিয়েছিলেন অতিথি তারা।

Supernova

সুপারনোভার বিস্ফোরণে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়া ধূলি আর গ্যাসের মিশ্রণ যে নেবুলার জন্ম দেয় তার নাম সুপারনোভা রেম্ন্যান্ট। চাইনিজ পণ্ডিতরা যে জায়গায় সুপারনোভা দেখতেন আমরা এখন সেখানে দেখি ক্র্যাব নেবুলা। সুপারনোভা রেম্ন্যান্ট। রাতের আকাশের সবচেয়ে সুন্দর নেবুলাগুলোর একটা হলো ক্র্যাব নেবুলা।

সুপারনোভা রেম্ন্যান্ট যে ধুলা আর গ্যাসের জন্ম দেয় সেগুলো বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে একদিন আবার জন্ম হয় নতুন সূর্যের, নতুন পৃথিবীর। আমরা নক্ষত্রের সন্তান। আমাদের শরীরের সব লোহা তামা শিশা এসেছে কোন এক মৃত নক্ষত্র থেকে।

৪।
সুপারনোভার কোরের চুপসানো ইলেকট্রন ডিজেনারেসি প্রেশার থামাতে পারে না। ইলেকট্রন আর প্রোটন এক হয়ে সেখানে নিউট্রন তৈরি করে। নিউট্রন স্টারে আলাদা কোন নিউক্লিয়াস নেই। আছে নিউট্রনের একটা সুপ। নিউট্রন ডিজেনারেসি প্রেশার তাকে আর কল্যাপ্স করতে দেয় না।

Neutron Star

সূর্যের ভরের আড়াই গুন একটা নিউট্রন স্টার হবে মাত্র ১০ কিলোমিটার চওড়া। তার একটা ম্যাচ বক্স সাইজের জায়গার ওজন হবে ৩ বিলিওন টন। নিউট্রন স্টারের ঘূর্ণন মারাত্মক। সেকেন্ডে ৭০০ বাড়ের বেশি রোটেট করে এমন নিউট্রন স্টারও পাওয়া গেছে। বারবার ঘুরতে ঘুরতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশান করে বলে অনেক নিউট্রন স্টারকে বলে পালসার।

৫।
নিউট্রন স্টারের গ্র্যাভিটি মারাত্মক। জেনারেল রিলেটিভিটি অনুযায়ী , সে অনেকখানি স্পেস টাইমকে বাঁকায়।

আরও বড় স্টারগুলোর চুপসানো নিউট্রন ডিজেনারেসি প্রেশারও থামতে পারে না। সে আরও ছোট হয়। আরও বেশি করে স্পেস টাইমকে বাঁকায়।

যত ছোট হবে গ্র্যাভিটি তত বেশি হবে। একসময় মুক্তি বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হবে। নিউট্রন স্টার তখন হবে ব্ল্যাক হোল। যে সীমা পর্যন্ত মুক্তি বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি থাকবে তার নাম ঘটনা দিগন্ত, ইভেন্ট হরাইজন। কিছুদিন আগে ব্ল্যাক হোলের যেই ছবিটা উঠেছে সেটা ইভেন্ট হরাইজনের ছবি। ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন ঘটনার শেষ সীমা, তার ওপাশ থেকে একটা আলোও বের হতে পারে না। এর বাংলা নাম ঘটনা দিগন্ত। ব্ল্যাক হোলের আকার বলতে বুঝায় তার ঘটনা দিগন্তের আকার, সত্যিকার নক্ষত্রটার আকার না।

ঘটনা দিগন্তের ওপাশে ব্ল্যাক হোল কত ছোট হয়? কোয়ান্টাম থিওরি অনুযায়ী, নিউট্রন ডিজেনারেসি প্রেশার অতিক্রম করার পর ব্ল্যাক হোলের কোয়ার্কগুলো সম্ভবত সব পাশাপাশি চলে আসবে। তখন তার নাম হবে কোয়ার্ক স্টার। হাইপোথেটিক্যাল কোয়ার্ক স্টারের সাইজ নিউট্রন স্টারের অর্ধেক। এর অস্তিত্বের এখন পর্যন্ত কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। প্রকৃতিতে কোয়ার্ক মুক্তভাবে থাকে না, কয়েকটা কোয়ার্ক এক হয়ে নিউট্রন প্রোটন মেসন এইসব গঠন করে।

একসময় কোয়ার্ক স্টারও হয়তো হার মানবে। পলির অপবর্জন নীতি অনুযায়ী ফারমিওনগুলো এক জায়গায় থাকতে পারে না। কোয়ার্ক মৌলিক ফারমিওন। এরপর ছোট হতে হলে ফারমিওনগুলোকে বোজোনে পরিণত হতে হবে।

Black Hole

বোজোন অপবর্জন নীতি মানে না। একটা জায়গায় যত খুশি বোজোন রাখা যায়। ব্ল্যাক হোলের সাইজ তাই খুবই ছোট হতে পারবে। কতো ছোট? একটা পরমাণুর সমান? একটা ইলেকট্রনের সমান? একেবারে শূন্য হতে পারে কি?

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বলে, খুবই ছোট জায়গায় কণাকে রাখতে গেলে তাদের ছোটাছুটি খুবই বেড়ে যাবে। র‍্যান্ডম্ ভাবে নানান রেঞ্জের ভরবেগ তাদের মধ্যে থাকবে। সাইজ তাই খুবই ছোট থাকতে পারবে না।

জেনারেল রিলেটিভিটির সমীকরণগুলো বলে, একেবারে শুন্য হয়ে গেলে স্পেস টাইমের বক্রতা অসীম হয়ে যাবে। এই জায়গায় ফিজিক্সের ব্রেকিং পয়েন্ট। সেখানে না কাজ করবে রিলেটিভিটির সূত্রগুলো, না কাজ করবে কোয়ান্টাম! এর নাম সিঙ্গুলারিটি।

ঘটনা দিগন্তের ওপাশে আসলে কি ঘটে কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না।

৬।
ঠিক কিভাবে স্থান কাল বাঁকে সেটা এই সিরিজের অংশ না, রিলেটিভিটির পর্বগুলোতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি, বিজ্ঞানে অজ্ঞান বইতে সব একসাথে আছে। কোয়ান্টাম সিরিজে আলোচনা করেছি হাইজেনবার্গের নীতি, সামনে আসবে পলির অপবর্জন নীতি আসবে। আর বলেছি ফার্মিয়োন আর বোজোনের গল্প।

পলির নীতি হলো সেই জিনিস যার কারণে দুনিয়া আমাদের কাছে সলিড মনে হয়। আমরা শেষ পর্যন্ত মাটির উপর দাঁড়াতে পারি।
পলির নীতি হলো সেই জিনিস যা ১০টা পরমাণুকে একই জায়গায় থাকতে দেয় না। কিন্তু ১০টা ফোটনকে ঠিকই একই জায়গায় থাকতে দেয়!

পলির অপবর্জন নীতি ব্ল্যাক হোল তৈরিতে বাঁধা দেয়!

(ব্ল্যাক হোলের উপর আরেকটা পর্ব লেখার ইচ্ছা আছে)

2 thoughts on “কোয়ান্টাম ২৬: নক্ষত্র আর ব্ল্যাক হোল : পলির অপবর্জন নীতি”

Leave a Reply