কোয়ান্টাম ২৫: হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র ২



কোয়ান্টাম ২৫
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র ২

১।
ছবিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা হাসিখুশি sin ওয়েভ। ডানে বামে সে বহুদূর পর্যন্ত গেছে।  অতদূর আঁকা সম্ভব না, অল্প কিছুদূর দেখানো হয়েছে ছবিতে।
এই sin ওয়েভটা সরল, সাধারণ। তার একটা মাত্র ফ্রিকোয়েন্সি। ধরি, সে সেকেন্ডে একবার করে উঠে, নামে, তার ফ্রিকোয়েন্সি তাই ১।

কণা কোথায় থাকে মনে আছে? ওই sin ওয়েভটার  উচ্চতা যেখানে যত বেশি, সেখানে কণাকে পাওয়ার সম্ভাবনা ততো বেশি। পুরো একটা পর্ব ধরে এই জিনিস বুঝিয়েছি, আশা করি মনে আছে।

এই sin ওয়েভটা যদি ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত লম্বা হয়, যত জায়গায় ওই sin ওয়েভ উঁচু নিচু হবে, সব জায়গায় কণা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আরও ভালোভাবে বললে, ওই তরঙ্গে কণা ঠিক কই আছে আমরা কেউ জানি না।

এইবার আসি ভরবেগের কথায়।
তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি f হলে ভরবেগ হবে p = hf /c. সোজা বাংলায়, ভরবেগ হচ্ছে ফ্রিকোয়েন্সির সমানুপাতিক।
এই অসীম বিস্তৃত তরঙ্গটার ফ্রিকোয়েন্সি একেবারে নির্দিষ্ট। ধরা যাক, ওই ফ্রিকোয়েন্সির মান হলো ১।
ফ্রিকোয়েন্সি নির্দিষ্ট মানে, ওই কণাটার ভরবেগ একেবারে নির্দিষ্ট। ফ্রিকোয়েন্সিকে h দিয়ে গুন দিয়ে, c দিয়ে ভাগ দিলে ওই ভরবেগ পাওয়া যাবে। যদি ধরে নেই, কোন একটা এককে h আর c দুইটার মানই ১, কণাটার ফ্রিকোয়েন্সি যা, ভরবেগও তাই। দুইটাই ১।

খেয়াল করেন, আমরা জানি না ওই কণা কোথায় আছে। ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত যে কোন জায়গায় সে থাকতে পারে। কোয়ান্টাম থিয়োরির অনেক ব্যাখ্যা মনে করে, ওই কণা একই সাথে ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত সব জায়গায় আছে, কিন্তু দেখতে গেলে তাকে আমরা র‍্যান্ডম্ ভাবে যে কোন এক জায়গায় খুঁজে পাবো।
হয়তো পাবো গাজীপুরের জঙ্গলে।
অথবা যমুনার চরে।

কিন্তু আমরা খুব ভালোভাবে জানি সে কোন ভরবেগ দিয়ে কোন দিকে যাচ্ছে। দেখতে গেলে তার ভরবেগ আমরা ১ পাবো, অন্য কিছু না। সে যেখানেই থাকুক না কেন, সেকেন্ডে ১ একক বেগে সে  ঢাকার দিকে যাচ্ছে। ক্লিয়ার?

২।
এইবার মনে করি, এই সহজ সরল হাসিখুশি সাইন ওয়েভটার সাথে আরেকটা sin ওয়েভ যুক্ত হলো। একটু ভাব নিয়ে যদি বলি, দুইটা তরঙ্গ ইন্টারফিয়ার করলো।

আগের তরঙ্গটার ফ্রিকোয়েন্সি ১, নতুনটার ফ্রিকোয়েন্সি ২।
যোগ হয়ে যেই তরঙ্গটা হবে তার হবে ২টা ফ্রিকোয়েন্সি, ১ আর ২।
আগে আমরা বলতে পারতাম আমাদের কণাটা খুব ভাল, তার গতিবেগ আমরা খুব ভালোভাবে জানি, সেটা হলো  ১ একক।
এখন আর আমরা সেটা জানি না। আমরা জানি, তার গতিবেগ ১ অথবা ২।
অথবা, একই সাথে ১ এবং ২, দেখতে গেলে যেকোনো একটা!

দুইটা তরঙ্গ যোগ হলে আরেকটা মজার জিনিস হবে। যেই জায়গাগুলোতে তরঙ্গ দুইটা একই বা কাছাকাছি দশায় যোগ হবে, সেখানে কণাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে, আর অন্য জায়গায় অনেক কমে যাবে।
আগে হয়তো কণাকে খুঁজে পাওয়া যেত ঢাকায়, রংপুরে, গাইবান্ধায়, গাজীপুরে, যমুনার চরে, বগুড়ার মিষ্টির দোকানে।
দুইটা তরঙ্গ যোগ হওয়ার পর হয়তো বগুড়াতে কণা পাওয়ার চান্স জিরো হয়ে গেলো।
বেচারা কণার মিষ্টি খাওয়ার আশা শেষ!

৩।
এইবার ধরি তিনটা তরঙ্গ যোগ হলো। কি হবে?
এইবার কণা আরও অল্প কয়েকটা জায়গার মধ্যে নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। কণাকে শুধু পাওয়া যাবে ঢাকায়, রংপুরে আর যমুনার চরে। ওই তিনটা জায়গায়ই তিনটা তরঙ্গই একই দশায় যোগ হয়েছে।
বাকি সব জায়গায় তারা একে অপরকে ধ্বংস করেছে।

আরেকটা জিনিস হবে, কি বলেন তো? এইবার কণাটার ভরবেগ তিন রকম হয়ে গেলো! ১, ২ অথবা ৩। কোনটা কেউ জানে না!!

৪।
আস্তে আস্তে অনেকগুলো তরঙ্গ যোগ করব। নিচের ছবিটার মতো।
আস্তে আস্তে কণার অবস্থান একেবারে নির্দিষ্ট হবে।
ধরি, ১০০০ টা তরঙ্গ যোগ করার পর কণাটাকে আমরা যমুনার চরের ৮ নাম্বার কুঁড়েঘরের ছাদের ১০ নাম্বার খড়ের মধ্যে ধরে ফেলেছি। তার বাইরে ওই কণাকে কোথাও পাওয়া যাবে না।

১০০০টা তরঙ্গের হাজার রকম ফ্রিকোয়েন্সি। হাজার রকম ভরবেগ। তাই,
যমুনার চরের ৮ নাম্বার কুঁড়েঘরের ছাদের ১০ নাম্বার খড়ের মধ্যে ওই কণাটা কতো ভরবেগে কোন দিকে যাচ্ছে এখন কেউ আর জানে না।
সে ঢাকার দিকে যেতে পারে, রংপুরে ব্যাক করতে পারে, বঙ্গোপসাগরের দিকেও রওনা দিতে পারে।

৫।
এই জিনিসটার নাম হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র। মহাবিশ্বের অলঙ্ঘনীয় নীতি। এর থেকে মুক্তি নেই।

একটা কণাকে খুব ছোট জায়গায় বেঁধে রাখতে গেলে তার ভরবেগ ভয়াবহ রকমের র‍্যান্ডম হয়ে যাবে। সে একই সাথে সব দিকে নানান রকম বেগে ছোটাছুটি করবে।

একটা কণার ভরবেগ নির্দিষ্ট করতে গেলে সে বিশাল জায়গা নিয়ে মেঘের মতো ছড়িয়ে পড়বে। তাকে কোথায় পাওয়া যাবে কেউ বলতে পারে না।

একটা কণাকে যদি খুব শক্তিশালী রশ্মি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি, তার অবস্থান মোটামুটি নির্দিষ্ট করে দেওয়া যাবে। তার ভরবেগ হয়ে যাবে মারাত্মক রকমের অনির্দিষ্ট।
যদি খুব দুর্বল রশ্মি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি, সে এখন কই আছে ধরতে পারবো না, কিন্তু বলতে পারবো সে কোনদিকে যাচ্ছে।

আমরা কখনই নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না, কণাটা এক মুহূর্ত পর ঠিক কথায় থাকবে। আমরা শুধু সম্ভাবনার কথা বলতে পারবো। এর বেশি কিছু বলার ক্ষমতা প্রকৃতি আমাদের দেয় নি।

৬।
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বলে, আলো সরল পথে চলে না। সব রকম পথে চলার তার একটা সম্ভাবনা আছে। তবে সরল পথের সম্ভাবনা বেশি।

এই নীতি বলে, ফোটনের একটা সম্ভাবনা আছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলার। সব সময় না, খুব ক্ষুদ্র জায়গায় ক্ষুদ্র সময়ের জন্য এটা সম্ভব। যে ভয়ঙ্কর কণাগুলো এই কাজটা করে তাদের নাম ভারচুয়াল ফোটন, হয়তো কোন একদিন তাদের নিয়ে লিখবো।

এই নীতি আরও বলে, খুব ক্ষুদ্র সময়ের জন্য শক্তির নিত্যতা সূত্র নাও খাটতে পারে। এর নাম কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান।

৭।
গাণিতিক প্রমাণ দিয়ে শেষ করার ইচ্ছা ছিল, দিলাম না, ওইটা আমার বইয়ের জন্য তুলে রাখলাম। এক কথায় সূত্রটা লিখে যাচ্ছিঃ যদি আমাদের তরঙ্গ Δx টা বিভিন্ন জায়গায় থাকতে পারে, আর তার ভরবেগ যদি Δp রকমের হয়, তাহলে

Δx * Δp ≥ ℏ/2

Δx কে কমালে Δp বেড়ে যাবে, Δp কে কমালে Δx. দুইটার গুণফল কখনই ℏ/2 এর চেয়ে কম হবে না।

আগামী পর্বে আসবে কোপেনহ্যাগেন ইন্টারপ্রিটেশান।

2 thoughts on “কোয়ান্টাম ২৫: হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র ২”

Leave a Reply