কোয়ান্টাম ১৬: আমরা যেভাবে দেখি



কোয়ান্টাম ১৬
আমরা যেভাবে দেখি

১।
ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ অন্ধ হয়ে গেছেন।
তাকে নিয়ে আসা হয়েছে বিরাট এক হলঘরে। মাথার অনেক উপরে ছাদ।
ছাদ যে অনেক উপরে সেটা বুঝতে পারছেন তাঁর চারপাশে গমগমে প্রতিধ্বনি শুনে। এমনিতে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, চারপাশে মৃত্যুর মতো কালো, ভয়ঙ্কর অন্ধকার।
আশেপাশে গমগমে কণ্ঠ্যে মানুষজন কথা বলছে। মাথার উপর শাঁ শাঁ শব্দে উড়ে যাচ্ছে কি জানি। বন্দুকের গোলা নাকি? দূরে সেগুলো বিকট শব্দে ফাটছে।

একটু পর কান ফাটানো শব্দে মাইকের অ্যানাউন্সমেন্ট আসলো : হাইজেনবার্গ, তুমি অনেক পাপ করেছো। তার পরও তোমাকে শেষ একটা সুযোগ দেওয়া হবে। তোমার মাথা থেকে ৩০ ফুট উপরে আমার একটা মূর্তি রাখা আছে, পাশে রাখা খাতা কলম দিয়ে ওই মূর্তির একটা ছবি আঁকতে হবে। ছবি যদি পুরোপুরি পারফেক্ট হয় তুমি আরেকটা চান্স পাবে। নাহলে ওই কামানের গোলাতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।
কিন্তু সাবধান, মূর্তির কোন ক্ষতি করা যাবে না।
হাইজেনবার্গ বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু আমি তো অন্ধ হয়ে গেছি  কিছু দেখতে পাচ্ছি না!
মাইক গমগম করে উঠলো, শুধু অন্ধ নয়, তোমার শ্রবণশক্তিও কেড়ে নেওয়া হবে। তোমার পায়ের কাছে একটা ব্যাট আছে, আর নানান সাইজের কতগুলো বল আছে। সেগুলো দিয়েই তোমাকে দেখতে হবে। সময়, ৩০ মিনিট।

সাথে সাথে মাইকের শব্দ থেমে গেল। উপরের শো শো শব্দও  বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হলো কামানের গোলার শব্দ। সম্পূর্ণ নীরবতায় গভীর কালো অন্ধকারে হাইজেনবার্গ একা দাড়িয়ে, এক হাতে ব্যাট আরেক হাতে বল।

২।
পায়ের কাছে নানান সাইজের বল রাখা আছে। হাইজেনবার্গ একটা একটা করে বল মূর্তির দিকে ছুড়ে মারলেন আর ব্যাট দিয়ে সেগুলো ধরার চেষ্টা করলেন।
একেক বল একেক দিকে গেল। প্রথম দিকে প্রায় সবই মিস। কয়েকটা বল মারার পর তিনি মূর্তিটার পজিশন বুঝতে পারলেন।
তারপর ওইদিক টার্গেট করে একের পর এক বল মারতে লাগলেন।

বড় বড় বলগুলো দিয়ে চোখ মুখ কিচ্ছু বোঝা গেল না। শুধু বোঝা গেল মূর্তিটার একটা না, দুইটা মাথা। আর পেছনে ডানার মতো কি জানি আছে। বড় বল মাথায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, ভেতরে চোখ মুখের ডিটেইল তাতে ফুটে উঠে না।

হাইজেনবার্গ আস্তে আস্তে আরও ছোট বলের দিকে গেলেন। ছোট বলগুলো কেন জানি ভারি। যত ছোট বল তত ভারি। অনেক জোরে মারতে হচ্ছে। কিন্তু আস্তে আস্তে মূর্তিটার চেহারা সমস্ত বীভৎসতা নিয়ে তাঁর সামনে ফুটে উঠছে।
মূর্তিটার সম্ভবত প্রতি মাথায় চারটা চোখ। চুলগুলো অদ্ভুতভাবে সাজানো। চোখ মুখের ডিটেইল ফুটে উঠেছে, চুলগুলোর ডিটেইল নিতে হলে আরও ছোট বল দরকার।

হাইজেনবার্গ তুলে নিলেন মটর দানার সমান ছোট, অথচ মারাত্মক ভারি একটা বল। ছুঁড়ে মারলেন প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে মূর্তির মাথায়। সাথে সাথে মূর্তি চুরচুর করে ভেঙ্গে গেল। কোন শব্দ নেই জন্য হাইজেনবার্গ সেই জিনিস দেখতে পারলেন না।

একটু পর একটা কামানের গোলা এসে তাঁকে ঝাঁঝরা করে দিলো।  

৩ ।
আমরা কিভাবে দেখি? আশেপাশের বস্তু থেকে নানান ‘সাইজের’ আলোর ফোটন ধাক্কা খেয়ে আমাদের চোখে আসছে। (সাইজ মানে তরঙ্গদৈর্ঘ্য এখানে, সত্যিকারের সাইজ না। )  রেটিনার রড আর কোন কোষগুলোতে মোটামুটি ৪০০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পেলে এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া করে, এর কম বেশি আলোতে ওই বিক্রিয়া কাজ করে না। তারপর চোখ থেকে এক ধরনের রাসায়নিক সিগন্যাল ব্রেইনের ভিজুয়াল কর্টেক্সে যায়, ব্রেইন আমাদের ওই জিনিসটা দেখায়।

E = hf আমাদের বলে, যত বেশি কম্পাঙ্ক তত বেশি শক্তি।
v = f × lamdba বলে, যত কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ততো বেশি কম্পাঙ্ক।
E = mc2 আমাদের বলে, যত ভর ততো শক্তি।
তিনটা এক করে পাই, যত ছোট কণা ততো বেশি ভারি সে, ততো বেশি শক্তিশালী।

যত ছোট জিনিস দেখতে চাবো, ততো ছোট কণা দিয়ে ধাক্কা মারতে হবে। ততো বেশি ডিটেইল ফুটে উঠবে।
কিন্তু, ছোট কণাগুলো মারাত্মক শক্তিশালী। সে একটু একটু করে জিনিসটাকে ধ্বংস করে দিবে।
পরমাণুর ভেতর ইলেকট্রন কোথায় কিভাবে আছে দেখতে হলে নরমাল আলোতে চলবে না। আরও অনেক অনেক শক্তিশালী কণা পরমাণুতে মারতে হবে। কিন্তু, ওই কণার এক ধাক্কায় ইলেকট্রন পরমাণু থেকে বের হয়ে যাবে।

ডিটেইলএর মূল্য অনেক। খুব ছোট কণাকে দেখতে হলে লাগবে মারাত্মক শক্তিশালী কণা।
২৭ কিলোমিটার পরিধির লার্জ হ্যাড্রন এক হিসাবে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ। ওই ২৭ কিলোমিটার লম্বা রাস্তায় প্রোটনকে তরণ দিয়ে আলোর বেগের 99.99999% বেগে নেওয়া হয়। তারপর প্রোটন প্রোটন মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। কি মারাত্মক শক্তি চিন্তা করেন! ওই শক্তি দিয়ে কণার জন্ম দেওয়া হয়, কণাকে ‘দেখা’ হয়।
কণাগুলো যদি স্ট্রিং দিয়ে তৈরি হয়, একটা কণার ভেতরে কি আছে দেখতে হলে যে হ্যাড্রন কলাইডারের দরকার হবে, ব্রায়ান গ্রিন সেটার মিনিমাম সাইজ বলেছেন একটা গ্যালাক্সির সমান।

৪।
এটাই কি হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব?
না। ওইটা আরও জটিল জিনিস।
আজকে হাইজেনবার্গের সাথে পরিচয় হলো, অনিশ্চয়তা পরে আরেকদিন আসবে।

Leave a Reply