কোয়ান্টাম ১৭



কোয়ান্টাম ১৭

১।
উলফ গ্যাং পলি ভয়ানক এক ধাঁধায় পড়েছেন। তাঁর চোখের সামনে পাক খাচ্ছে অবাস্তব এক ঘূর্ণি। হিসাব করে দেখা গেছে এই ঘূর্ণির বেগ নাকি আলোর বেগের চেয়ে বেশি। আরও ঝামেলার ব্যাপার হচ্ছে ঘূর্ণি পুরো দুই পাক ঘুরে আসলে তাকে আগের মতো লাগে।

হাতে একটা গ্লোব নিয়ে ঘুরান। ধরেন শুরুতে সামনে আছে বাংলাদেশ। কত ডিগ্রি ঘুরালে আবার বাংলাদেশ সামনে আসবে?
৩৬০ ডিগ্রি।
হাতে মোবাইলটাকে নিয়ে ঘুরান। কত ডিগ্রি ঘুরালে আমার সামনের স্ক্রিনটাকে দেখা যাবে?
৩৬০ ডিগ্রি।

পলির সামনের ওই ঘূর্ণিটা নাকি ৭২০ ডিগ্রি ঘুরলে আগের অবস্থায় ফিরে আসে। হিসাব মিলছে না কিছুতেই।

২।
ঘটনার শুরু বেশ কয়েক বছর আগে।

বোরের বর্ণালির কথা মনে আছে? ওই যে ইলেকট্রন এক স্তর থেকে আরেক স্তরে লাফিয়ে উঠত আর লাফিয়ে ওঠার শক্তি থেকে নানান রঙের বর্ণালির জন্ম হতো?
E = hf. শক্তির পার্থক্য E হলে বর্ণালির আলোর কম্পাঙ্ক হবে f. ইজি পিজি।
এই সহজ হিসাবটাতে ঝামেলা শুরু হয়েছে।
ইলেকট্রন এক স্তর থেকে আরেক স্তরে লাফিয়ে উঠলে শক্তির পার্থক্য কত রকম হবে?
একরকম।
কি সেটা? E = hf. বর্ণালিতে রেখা হবে একটা।
রেখা একটা হচ্ছে না। কয়েকটা সূক্ষ্ম রেখা দেখা যাচ্ছে।

ব্যাখ্যা দিলেন প্রফেসর সমারফেল্ড। প্রফেসর সমারফেল্ড বোরের চেয়ে সতের বছরের বড়, দুইটা কোয়ান্টাম সংখ্যার জন্ম দিয়ে তিনি মোটামুটি হারিয়ে যাবেন। তাঁর পরমাণু মডেলও কিছুদিনের মধ্যে বাতিল হয়ে যাবে।
তবু, মায়া না বাড়িয়ে, সমারফেল্ডের ব্যাখ্যাটা শুনে আসি।  

Sommerfeld

৩।
সমারফেল্ড বললেন, বৃত্তাকার কক্ষপথে ইলেকট্রনকে ঘুরতে হবে এমন কোন কথা নেই।
পৃথিবী উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে। মঙ্গল উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে।
উপবৃত্তাকার পথ ডিমের মতো। ডিম জিনিসটাকে সবাই খুব পছন্দ করে।
ইলেকট্রনও ডিমের মতো পথে ঘুরে।
বোরের একেকটা শক্তিস্তরের জায়গা দখল করলো কয়েকটা করে নানান সাইজের ডিমের মতো স্তর।
প্রথম কক্ষপথ n = 1. n = 1 এর জন্য আগে একটা গোল কক্ষপথ ছিল, এখনো তাই আছে।
n = 2 এর বদলে আসলো দুইটা কক্ষপথ। একটা গোল আরেকটা ডিমের মতো।
n = 3 এর জন্য আসলো তিনটা। গোল, ডিমের মতো, আর বেগুনের মতো।
জন্ম হলো নতুন কোয়ান্টাম নাম্বারের, l.
n এর কোন একটা মানের জন্য n টা l পাওয়া যায়।
এগুলোর মান 0 থেকে n – 1 পর্যন্ত।

তো, ডিমের মতো, বেগুনের মতো নানান সাইজের কক্ষপথ পেয়ে ইলেকট্রন মহানন্দে সেখানে ঘুরাঘুরি করতে লাগলো। একি n এর জন্য সবগুলো l এ শক্তির পরিমাণ একি। কিন্তু ইলেকট্রন আবার অনেক স্পিডে দৌড়ায়, স্পিড খুব বেশি হলে কি হবে? ভর বাড়বে। যেই কক্ষপথটা বেশি বেগুনের মতো ওই কক্ষপথে ইলেকট্রন একসময় নিউক্লিয়াসের বেশি কাছে দিয়ে যাবে। তখন ওই ইলেকট্রনটার ভর, একি শক্তির অন্য রাস্তায় চলা ইলেকট্রনদের চেয়ে একটু বেশি হবে। ভর একটু বেশি হলে শক্তিও একটু বেশি হবে। ওই ইলেকট্রনটা যখন লাফ দিয়ে অন্য স্তরে যাবে, শক্তির পার্থক্য একটু এদিক ওদিক হবে।
আগে একটা E = hf পাওয়া যেত, এখন কয়েক রকমের E = hf পাওয়া যাবে।
হিসাব মিলল?

৪।
কয়েকদিন পর আবার যন্ত্রণা শুরু হলো। জিম্যান নামে এক ঘারতেড়া বিজ্ঞানী ওই রেখাগুলোকে চুম্বক ক্ষেত্রে বসিয়ে দেখলেন, ফাজিলগুলো আবারও কয়েকটা রেখায় আলাদা হয়ে গেছে।
বোর মহা যন্ত্রণায় পড়লেন। এতো ঝামেলা করতে কে বলেছিল এদের?! কি দরকার ছিল এত চুম্বক নিয়ে টানাটানি করার!

আবারও রেস্কিউতে আসলেন সমারফেল্ড। বললেন, এই জিনিস হয় কারণ কক্ষপথগুলো একেকটা একেক তলে আছে। কোনটা XY বরাবর, কোনটা YZ. চুম্বক ক্ষেত্রে আনলে যেই তলটা চুম্বক ক্ষেত্রের দিকের কাছাকাছি আছে তার শক্তি একরকম হয়, দূরের গুলোর শক্তি অন্য রকম হয়।

আরেকটা কোয়ান্টাম নাম্বারের জন্ম হলো। ম্যাগনেটিক কোয়ান্টাম নাম্বার m.
m এর মান -l থেকে l পর্যন্ত।
l = 0 হলে ইলেকট্রন একটা তলে ঘুরে। m = 0.
l = 1 হলে ইলেকট্রন ৩টা তলে ঘুরে। ৩ রকম কোন করে। m = -1, 0, 1
l = 2 হলে ৫টা তল। m = -2, -1, 0, 1, 2 . ক্লিয়ার?

৫।
বিজ্ঞানী অটো স্টার্ন বোরের মডেলের ঘোর বিরোধী। তিনি খুবই সিরিয়াস টাইপের নো ননসেন্স বিজ্ঞানী।
তাঁর সাথে সমসময় একটা হাতুড়ি থাকে। যন্ত্রপাতি কথা না শুনলে হাতুড়ি দিয়ে ভয় দেখান।
স্টার্ন এবার রেডি হচ্ছেন বোরের মডেলকে ব্রেক করার জন্য।
কিছুদিন পর তিনি এমন এক আবিষ্কার করবেন, দুনিয়াবাসির মাথা ঘুরে যাবে।
তখন রেস্কিউতে আসবেন উলফ গ্যাং পলি।
আজকে শেষ, ওই গল্প আরেকদিন হবে।

Leave a Reply