কোয়ান্টাম ৩১: ফার্মিওনঃ পলির অপবর্জন নীতি



কোয়ান্টাম ৩১

ফার্মিওনঃ পলির অপবর্জন নীতি

এইখানে একটা পাথর বসে আছে। সে স্থান দখল করেছে। আপনি চাইলেও ওই একই জায়গায় আরেকটা পাথর রাখতে পারবেন না। ওই সলিড পাথরটা আপনাকে বাঁধা দিবে। গুড়া করে, এমনকি তরল করেও লাভ হবে না। পদার্থ স্থান দখল করে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন, পদার্থ কেন স্থান দখল করে? কেন এক জায়গায় দুইটা পাথর রাখা যায় না?

১।

লাল বাবু সাদা বাবুদের গল্প মনে আছে? ঐযে তাঁরা একসাথে ঘুরতেন, একসাথে চলতেন, শেষ দেখতেও একরকম হয়ে গিয়েছিলেন? নাম চেঞ্জ করে রেখেছিলেন গোলাপি বাবু?

এটা ওই গল্পের বাকিটা।

জুরাইন এলাকায় থাকতেন সবুজ বাবুরা। তাঁরা দেখতে হুবহু একই রকম, খাওয়া দাওয়া এক, একই গান শুনেন, একই ব্র্যন্ডের জুতা পড়েন। কিন্তু তাঁরা গোলাপি বাবুদের মত না।

গোলাপি বাবুরা একে অন্যকে খুবই পছন্দ করেন। একটা গোলাপি বাবু এক গর্তে পরলে অন্য সব গোলাপি বাবু সেখানে ঝাঁপ দেন।

এই অসভ্যতা সবুজ বাবুদের পছন্দ না। নাহয় দুই সবুজ বাবুই এক রঙের জামা পড়েন (সবুজ রঙের, ডিফিনিটলি), একই খাবার পছন্দ করেন, তাই বলে একই গর্তে দুইজন থাকবেন?

কক্ষনো না।

সবুজ বাবুরা নীতিবান মানুষ। তাঁরা বোজোনদের  মত অসভ্য না।

তাদের নীতির নাম পলির অপবর্জন নীতি। এই নিতি অনুযায়ী, একে অপরকে দেখলে বলতে হয়, দুরে গিয়ে মর।

সবুজ বাবুদের নাম ফারমিওন।

ফারমিওন হলো এমন সব কণা যারা পলির অপবর্জন নীতি মেনে চলে। এক জায়গায় একই রকম দুইটা কণা থাকে না।

আজকের গল্প ফার্মিওনদের নিয়ে।

চলুন দেখে আসি কি এই অপবর্জন নীতি।

২।

কোয়ান্টাম ৩০ পড়েছেন তো? গোল গর্ত, চারকোনা গর্তের কথা মনে আছে?

দুই গর্ত খুব কাছাকাছিই থাকলে, কোন একজন সবুজ বাবুর দুই গর্তেই পড়ার সম্ভাব্যতা প্রায় সমান।

কোয়ান্টাম জগত চলে তরঙ্গ নিয়ে, তরঙ্গের বিস্তার ψ এর কথা মনে আছে? বিস্তার হলো সম্ভাব্যতার বর্গমূল।

ধরি,

এক নাম্বার সবুজ বাবুর গোল গর্তে পড়ার সম্ভাব্যতা ১/৪। গোল গর্তে পড়ার বিস্তার হবে ১/৪ এর বর্গমূল। ১/২।

চারকোনা গর্তের ক্ষেত্রেও একই কথা।

এই বিস্তারের আমরা নাম দেই ψ1.

ψ1 = ১/২।

দুই নাম্বার সবুজ বাবুর, গোল গর্তে পড়ার সম্ভাব্যতা ১/৯।  বিস্তার তাই ১/৩।

চারকোনা গর্তের ক্ষেত্রেও একই কথা।

এই বিস্তারের আমরা নাম দেই ψ2 .

ψ2  = ১/৩।

সবুজ বাবুরা বোজন হলে আমরা বিস্তার গুন করে যোগ করতাম। দুই বাবুর খুব কাছাকাছি দুই গর্তে থাকার বিস্তার হতো তাহলে  ১/২ * ১/৩ + ১/৩ * ১/২ = ১/৩ ।

বর্গ করলে হতো ১/৯, যেটা কিনা দুই বাবুর খুব কাছাকাছি দুই গর্তে পড়ার সম্ভাবনা।

এখন আমরা বিস্তার গুন করে বিয়োগ করব। দুইটা ফারমিওনের তরঙ্গ উলটা হয়ে যোগ হয়।

এখন দুই বাবুর খুব কাছাকাছি দুই গর্তে পড়ার বিস্তার হবে  ১/২ * ১/৩ – ১/৩ * ১/২ = ০

বর্গ করলেও পাই, ০। দুই বাবুর খুব কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনা ০।

বোজোনদের বেলায় সূত্র ছিল ψ = ψ1* ψ2  + ψ2* ψ1

ফারমিওনদের বেলায় সূত্র ψ = ψ1* ψ2  – ψ2* ψ1 = 0 ।

এর নাম পলির অপবর্জন নীতি। দুইটা একই রকম  ফারমিওন একই স্টেটে থাকার সম্ভাবনা শুন্য।

৩।

নিচের ছবিতে গোলগাল সুন্দর একটা পরমাণু দেখা যাচ্ছে। এই পরমাণু নিয়ে বহুবার বহু মডেল এসেছে, কোনটাই এর সবগুলো ধর্ম ব্যাখ্যা করতে পারে নি।

কোয়ান্টাম সিরিজের একবারে শুরুতে লিখেছিলাম বোরের মডেলের গল্প। বোরের পরমাণুতে আছে অনেকগুলো শক্তিস্তর, একেকটা স্তরে ইলেকট্রনগুলো ঘুরাঘুরি করে। প্রথম স্তরে থাকে ২টা, তারপর ৮টা, তারপর ১৮টা এরকম। এই নিয়ম কেন কাজ করে বোরের কোন ধারনা ছিল না।

তারপর আসলো সমারফিল্ডের মডেল। আসলো ৪টা কোয়ান্টাম সংখ্যা। সমারফিল্ড বললেন, ইলেকট্রন নাকি নানা জাতের উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরে। একেকটা কক্ষপথ আবার নানা তলে থাকতে পারে। একি শক্তিস্তরে  থাকে অনেকগুলো উপবৃত্তাকার শক্তিস্তর, সেগুলোর প্রতিটাতে থাকে আবার অনেকগুলো তল। এই উপবৃত্তাকার তলগুলোর নাম দেওয়া হয় অর্বিট্যাল।

সেই সময় প্রথম টের পাওয়া যায়, একটা অর্বিট্যালে আসলে দুইটার বেশি ইলেকট্রন থাকতে পারে না।

তারপর অনেক দিন গেল। পদ্মা মেঘনায় অনেক পানি গড়াল।

ডি  ব্রগ্নি নিয়ে আসলেন নতুন মডেল। ওইখানে ইলেকট্রন স্থির তরঙ্গের আকারে পরমাণুর চারপাশে ঘুরে।

সব শেষে আসলো শ্রডিঙ্গারের মডেল। ততদিনে অনেক বছর পার হয়ে গিয়েছে। উপবৃত্তাকার কক্ষপথের ধারণা বাতিল হয়ে গিয়েছে। ইলেকট্রন থাকে এখন গোল, ডাম্বেলাকার আরও নানান ধরনের অর্বিট্যালে। তার চেয়ে বড় কথা সব ইলেকট্রন ঘুরে না, ঘুরলেও নিউক্লিয়াসের চারপাশে না।  এই বিশাল, রহস্যময় মডেল নিয়ে সামনে আরও অনেক কিছু লেখার আছে, আজকে আর বেশি বলব না। ব্যাপার হচ্ছে, অরবিট্যাল গোল হোক, ডিমের মতো হোক, যাই হোক, আগের সেই ঝামেলা থেকেই গেল।

একটা অর্বিট্যালে আসলে দুইটার বেশি ইলেকট্রন থাকতে পারে না।

এই রহস্যের সমাধান করে পলির অপবর্জন নীতি। ইলেকট্রন হলো ফার্মিওন। একটা জায়গায় একই রকম ইলেকট্রন  মাত্র একটা থাকতে পারে।

একটা অরবিট্যালে দুইটা ইলেকট্রন থাকতে পারে কারণ ওই দুইটা ইলেকট্রন একই রকম না। দুইটার স্পিন দুই রকম। একটার +১/২, আরেকটার -১/২। দুই সতীন দুই রকম, মারামারি করে না।

পরমাণু যদি বোজোন দিয়ে তৈরি হতো তাহলে কি হতো? কেউ একজন কিছুদিন আগে একটা পোস্টে দাবি করলো পৃথিবী নাকি আলোর তৈরি। পৃথিবী সত্যি সত্যি আলোর তৈরি হলে কি হতো?

খেয়াল করেন, ইলেকট্রন যদি বোজোন হতো, একটা ইলেকট্রন একটা ঘরে (অরবিট্যালে) ঢুকলে সবাই ওইখানে ভিড় করতো। বোজোন চরম অসভ্য প্রাণী, সে প্রাইভেসি বুঝে না। তখন কক্ষপথ বলতে কিচ্ছু থাকত না, সব ইলেকট্রন একই জায়গায় থাকতো। ধাতুর বাইরের কক্ষপথে একটা দুইটা ইলেকট্রন থাকে, ওই ইলেকট্রন সে সহজে ছেড়ে দিতে চায়। তখন কারো কোন ইলেকট্রন ছেড়ে দেওয়ার দরকার হতো না। কারো ইলেকট্রন গ্রহণের দরকার হতো না। সব বিক্রিয়া তখন বন্ধ হয়ে যেত। সোজা কথায়, পুরা কেমিস্ট্রি শেষ। নানান জাতের সক্রিয় ধাতু, ভয়ঙ্কর অ্যাসিড, কার্বনের প্রাণী, বিষাক্ত গ্যাস সব শেষ। বিরক্তিকর বোরিং বোজোনের দলা ঘুরে বেড়াতো মৃত একটা মহাবিশ্বে!

৪।

সূর্যে যখন জ্বালানী শেষ হবে, মহাকর্ষের প্রচণ্ড চাপে চুপসে যেয়ে সে হবে খুব ছোট একটা হোয়াইট ডোয়ার্ফ। ওই জিনিস এতো ঘন হবে যে তার এক চামচের ভর হবে একটা ট্রাকের সমান। প্রচণ্ড চাপে পরমাণুর ভেতরের স্ট্রাকচার তখন ভেঙ্গে যাবে। হোয়াইট ডোয়ার্ফ হবে নিউক্লিয়াস আর ইলেকট্রনের একটা সুপ টাইপের জিনিস।

হোয়াইট ডোয়ার্ফকে আরও ছোট হতে বাঁধা দিবে পলির নীতি। দুইটা ইলেকট্রন খুব কাছাকাছি আসলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট হয়। কম্পাঙ্ক বাড়ে। কম্পাঙ্ক বাড়া মানে ভরবেগ বাড়া। এই ভরবেগের জন্য যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় সেটা শেষ রক্ষা করে সাদা বামনকে। এই চাপের নাম ইলেকট্রন ডিজেনারেসি প্রেশার। এই চাপের জন্য হোয়াইট ডোয়ার্ফ আর ছোট হতে পারে না।

এর পরের কাহিনী কোয়ান্টাম ২৬ এ বলেছি, আজকে আর লিখতে ইচ্ছা করছে না।

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10219131258060503&id=1478477285

Leave a Reply