ফিজিক্স



ফিজিক্স
(এই লেখাটার টার্গেট ছিল স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা, তাই তুমি সম্বোধন ইউজ করা হয়েছে)

“আমি ঘর হইতে বাহির হইয়া
জ্যোৎস্না ধরিতে যাই
আমার হাত ভর্তি চাঁদের আলো
ধরলে গেলেই নাই! ”
-হুমায়ুন আহমেদ

আমার এইচ.এস.সি ২০০৭ সালে। এখন যেরকম গুগোল ইউটিউব ঘাঁটলেই সবকিছু পাওয়া যায় তখন সেরকম ছিল না। তখন গুগোল নতুন এসেছে, আস্তে আস্তে ব্যাবহার বাড়ছে। মোবাইলে ইন্টারনেট তখনো আসে নি। আমার ব্যাক্তিগত পিসি ছিল না, মাঝে মাঝে সাইবার ক্যাফেতে যেয়ে নেট ঘাঁটতাম।
সেই যুগে লেখাপড়ার উপায় ছিল বই, গাইড আর টিচার। এখন যেরকম হাজার হাজার, লাখ লাখ কোচিং সেন্টার আছে, হাজার হাজার স্যার আছে তখনও সেরকম ছিল। সবাই ক্লাস শেষে দল বেঁধে এই কোচিং ওই কোচিংএ যেত, এই স্যারের নোট, ওই স্যারের সাজেশন নিয়ে হইচই করতো।
আমার টিচার ছিল না। কোচিং ছিল না। আমি ট্রেন্ড ফলো করায় বিশ্বাসী নই, আমার জীবন কেমন হবে আমি ডিফাইন করবো। টিচার কোচিং না থাকাতে আমার খুব একটা ক্ষতি হয়েছে বলব না, বরং অনেক লাভ হয়েছে। আমি বুয়েট সি এস ই, মেডিক্যাল এস এস এম সি দুই জায়গায় চান্স পেয়েছিলাম।
ইন্টারের ওই দিনগুলো আমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। যখন বুঝতে পারবা তোমাকে হেল্প করার কেউ নেই, একটা আশ্চর্য সুন্দর জানালা তোমার সামনে ওপেন হবে।

দুই চারটা কাহিনী বলি :
আমাদের ইন্টারের ফিজিক্স বইটা লিখেছিল রানা চৌধুরী আর শাহজাহান তপন নামের দুইজন। আমি এদের কাছে ঋণী, এতো বাজে বই হাতে না পেলে আমি কোনোদিন ফিজিক্সকে ভালবাসতে শিখতাম না। তরঙ্গ চ্যাপ্টার পড়ছি। স্থির তরঙ্গের নাকি ৭ টা বৈশিষ্ট্য আছে। এই সাতটা বৈশিষ্ট্য মুখস্ত করলে পরীক্ষায় পাশ করা যাবে। নিচে দুইটা ছবি, সুস্পন্দ বিন্দু আর নিস্পন্দ বিন্দুর। এই সাতটা পয়েন্ট পড়ে আর ছবি দেখে স্থির তরঙ্গকে বুঝার কোন উপায় নেই।

আমার জিদ চেপে গেল। খাতা পেন্সিল নিয়ে বসলাম স্থির তরঙ্গ সিমুলেট করতে। ছোট্ট একটা তরঙ্গ, কণাগুলোর উচ্চতা 0 1 2 3 2 1 0 -1 -2 -3 -2 -1 0. কণাগুলো উঠলো নামল, তরঙ্গ একটু করে সামনে আগাল। একটু পর তরঙ্গ খাতায় আঁকা দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসলো। আর মুহূর্তে, সুস্পন্দ বিন্দু, নিস্পন্দ বিন্দু, বইয়ে কতটুকু ঠিক কতটুকু ভুল সব ক্লিয়ার হয়ে গেল। স্থির তরঙ্গ কে আবিষ্কার করেছে আমি জানি না, আমার মনে হলো আমি এই জিনিসের দ্বিতীয় আবিষ্কারক, এই জিনিস আমারও!

একটা জিনিস নিজে নিজে বুঝার আনন্দ মারাত্মক, কোচিং করা ছেলে মেয়েরা এই জিনিস বুঝবে না। গভীর রাত, আশেপাশে সবাই ঘুমাচ্ছে, বলবিদ্যার একটা জটিল প্রবলেম নিয়ে বসে আছি, আধ ঘণ্টা চেষ্টার পর যদি অঙ্ক মিলে, মনে হবে এইটা আমার অ্যাচিভমেন্ট , এইটা আমি বুঝি। কোন জিনিস একেবারেই না বুঝলে গাইড দেখতাম, তখন মনে মনে একটা গিলটি ফিলিং কাজ করত, এই অঙ্কটা আমার হতে পারত, হলো না।

ওই দিনগুলো আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে, সেটা হলো অ্যানালাইসিস। বিজ্ঞানীরা এতো কিছু কিভাবে জানলো? পরীক্ষা করে করে? না। তাঁরা ছিলেন ফাটাফাটি লেভেলের ডিটেকটিভ। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র F = G m1m2/d2. কারো মাথায় একবারও আসে নি নিউটন এই জিনিস কই পেলো? আইনস্টাইন যখন আপেক্ষিক তত্ত্ব দেয় তার হাতে একটা মাত্র ক্লু ছিল, আলোর বেগকে ক্রস করা যায় না। এই মানুষগুলো ছোট্ট একটা সূত্র ধরে খুঁড়তে আশ্চর্য সব রত্ন বের করে এনেছে। আপেক্ষিক তত্ত্ব কোন পরীক্ষা থেকে আসে নি, এসেছে আইনস্টাইনের অ্যানালাইসিস থেকে। আলোর বেগের কাছাকাছি গেলে সময় স্লো হয়, দৈর্ঘ্য কমে যায়। এখানে কারো মনে প্রশ্ন আসে নি, কেন কমে যায়? আঠারো বছর বয়সের উলফগ্যাং পলি জেনারেল রিলেটিভিটি নিয়ে পেপার লিখেছিল। আমরা কেউ কেউ জেনারেল রিলেটিভিটি একটু একটু জানি, কেউ কি বুঝি? জেনারেল রিলেটিভিটি বাদ দেই, নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র কতজন সত্যি সত্যি বুঝে?

এখন রাত একটা বাজে। আমার জানালার বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার, সেখানে জ্বলজ্বল করছে অজস্র নক্ষত্র। ওই আকাশের দিকে যেখানেই তাকাই না কেন, ছেচল্লিশ বিলিয়ন আলোকবর্ষের চেয়ে দূরে দেখতে পারবো না। ওইটা অব্জারভেবল ইউনিভার্সের সীমা। ছেচল্লিশ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে যখন তাকাবো, আমরা দেখবো তেরশ আশি কোটি বছর আগের মহাবিশ্ব। তার কিছুদিন আগে বিগ ব্যাং হয়েছে। বিগ ব্যাং এর পর প্রথম তৈরি প্লাজমা পদার্থগুলো একটা অস্বচ্ছ পর্দা তৈরি করেছে, তার ওপাশে দেখা যায় না। কি আছে ওই পর্দার ওপাশে? বিগ ব্যাং এর আগে কি হয়েছিলো? ওই ছেচল্লিশ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে এই মুহূর্তে কি হচ্ছে? আর কত অসংখ্য ছেচল্লিশ বিলিয়ন আলোকবর্ষ চওড়া এই পুরা ইউনিভার্সটা? স্পেস যদি শেষ হয়, কি আছে তার ওপাশে?

হাতে মাইক্রোস্কোপ নিলে, একটু পরে ঢুকতে হবে আরেক আজব দুনিয়ায়। কোয়ান্টামের জগতে। কণাগুলো যখন একই সময়ে দুই জায়গায় উঁকি মারা শুরু করবে, আলোর চেয়ে বেশি গতিতে তার ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করা শুরু করবে, তখন যদি তাদের ভালো করে দেখতে যাও, সামনে পরবে আরেকটা পর্দা। সবচেয়ে ছোট লিমিট প্ল্যাঙ্কের দৈর্ঘ্য, তার ওপাশে কি হচ্ছে কেউ জানে না । কেউ কেউ বলে, ওখানে নাকি স্ট্রিং এর রাজত্ব, এগারোটা ডাইমেনশনে স্ট্রিঙগুলো কাপাকাপি করে নাকি কণার জন্ম দিচ্ছে!

চারদিকে অন্ধকার পর্দা, মাঝখানে বসে অসহায় মানুষ ছটফট করছে, তার কাছে একটা মাত্র হাতিয়ার : ছিয়াশি বিলিয়ন নিউরনের তৈরি অদ্ভুত রহস্যময় এক ভয়াবহ পাওয়ারফুল মস্তিষ্ক। ইচ্ছা করে না তাকে ব্যাবহার করতে?

(ছবিটা পিলার্স অভ ক্রিয়েশন নামের নেবুলার, ওখানে হাজার হাজার নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে। )

One thought on “ফিজিক্স”

Leave a Reply