কোয়ান্টাম ২৯: বোজোন



কোয়ান্টাম ২৯
বোজোন

১।
সত্যেন বোসের কথা মনে আছে? সেই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের লেকচারার, ছাত্র পড়াতে গিয়ে হুট করে একদিন মাথায় বিরাট বড় একটা আইডিয়া আসলো, চিঠি লিখে বসলেন আইন্সটাইনকে? আইনস্টাইন বোসবাবুর কাজ দেখে এতটাই মুগ্ধ হলেন, তিনি নিজে বোসের কাজ জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন।

খুব অল্প কয়েকজন বাঙ্গালি নোবেল প্রাইজ পাওয়ার মতো কাজ করেছিলো, সত্যেন বোস তাদের একজন। আইনস্টাইন তাঁর যে পেপারটা নিজে আগ্রহ করে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন তাকে আজ আমরা চিনি বোস-আইন্সটাইন স্ট্যাটিস্টিক্স নামে। দুই ধরনের কণা আছে বলেছি না, ফার্মিওন আর বোজোন? পল ডিরাক বলবাহি কণাগুলোর নাম রাখেন বোজোন, সত্যেন বোসের নামে। বোজোনের দুনিয়া রহস্যময়, অস্বাভাবিক, প্রায় অলৌকিক। চলুন ঘুরে আসি বোজোনের পৃথিবী থেকে।

২।
এখন গল্প লিখছি।

বোস বাবু বাজারে গেছেন। ফাইনম্যানের মতো ইলেকট্রন কিনতে না, স্রেফ ডিম কিনতে। দোকানদার তাকে এক হালি ডিম দিলো, বোসবাবু সেগুলো কিনে বাড়ি ফিরছেন।

ফিরতে ফিরতে তাঁর মনে হলো, এই চারটা ডিম চার রকম কেন? একই রকম হলে কি হতো? কেন ইলেকট্রনগুলো একই রকম হয়, ডিমগুলো হয় আলাদা?

বোস বাবু ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে কখন যে একটা ডিম ভেঙ্গে ফেলেছেন খেয়াল নেই। আসলেই তো, ডিম যদি আইডেন্টিক্যাল পার্টিকেল হতো, কিছু কি এসে যেত?

২৭ তম পর্বে আইডেন্টিক্যাল পার্টিকেলের গল্প বলেছিলাম, এমনি এমনি বলি নি। যদি দুইটা কণার মধ্যে সামান্যতম পার্থক্য থাকে, প্রকৃতি ব্যাপারটা মনে রাখে। দুইটা ইলেকট্রন একই রকম, দুইটা ডিম কিন্তু একই রকম না। দুইটা ডিম সব সময় দুই রকম। একটা মোটা আরেকটা চ্যাপ্টা। একটা লম্বা একটা খাটো। একটা সাদা একটা পিঙ্ক কালারের!

যদি কোন ম্যাজিক মুরগি দুইটা হুবহু একই রকম ডিম পারে তাহলে কি হবে? দেখতে একই রকম হলেই হবে না, প্রতিটা ইলেকট্রন, প্রতিটা প্রোটন একই অবস্থায় থাকতে হবে। যদি প্রতিটা পরমাণু হুবহু একই করে ফেলি, তারপর প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ডিমগুলো জমিয়ে প্রতিটা ইলেকট্রনের শক্তি একই রকমে নিয়ে আসি তাহলে?

তাহলে একটা খুব আশ্চর্য জিনিস হবে।
কি হবে সেটা বোঝার জন্য আমাদের ডিমের কণাগুলোর স্পিন যোগ করতে হবে।
ডিমের ইলেকট্রনগুলোর স্পিন ১/২, প্রোটন আর নিউট্রনগুলোরও ১/২। বোজোনগুলোর ১ বা ০।
সবগুলোর স্পিন যোগ করেন। বাদ যাবে না একটি শিশুও।

বোজোনের স্পিন পূর্ণ সংখ্যা হয়। ১, ২, ৩ এরকম।
ফারমিওনের ১/২, দেড়, আড়াই এরকম।
সবগুলো স্পিন যোগ করে যদি পূর্ণ সংখ্যা হয়, তাহলে কেল্লা ফতে।

আমাদের ডিমগুলো আইডেন্টিক্যাল বোজোন হয়ে গেছে।
তার মানে বুঝেন?
আপনি এখন থেকে একই জায়গায় দুইটা ডিম রাখতে পারবেন।
যদি ১০টা ডিমকে এই কাজ করতে পারেন, একই জায়গায় ১০টা ডিম রাখতে পারবেন।
ডিমগুলো একটু দুরে রাখলে ওরা নিজেরাই আসলে একটু পর একই জায়গায় চলে আসবে, হাইজেনবার্গের নীতি অনুযায়ী সবাই একটু আধটু নড়াচড়া করে।
বোজোনগুলো এক জায়গায় থাকতে খুবই পছন্দ করে। সবগুলো ডিম এক জায়গায় চলে আসবে।

৩।
আলোর কণাগুলো বোজোন। একটা জায়গায় যত খুশি বোজোন রাখা যায়। আলোর কণাকে তাই সলিড মনে হয় না, মনে হয় ভূতুরে জিনিস।

খুবই খুবই অল্প তাপমাত্রায় হিলিয়ামকে লিকুইড করা হয়। কতো কম? এক ন্যানো ক্যালভিন তাপমাত্রায়। এই তাপমাত্রা খুবই খুবই কম, মহাবিশ্বের সবচেয়ে কম তাপমাত্রা বলা যায়। হিলিয়ামে থাকে ২টা প্রোটন, ২টা নিউট্রন, ২টা ইলেকট্রন। স্পিন যোগ করে হয় তিন। এই ভয়াবহ শীতল হিলিয়ামে পরমাণুগুলো তাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। তারা এক জায়গায় থাকবে, একই ভাবে চলবে। কোন ঘর্ষণ নেই, সান্দ্রতা নেই। একটু চামচ দিয়ে নাড়িয়ে দিলে বছরের পর বছর নড়তে থাকবে। এই জিনিসের নাম বোস আইনস্টাইন কনডেনসেট।

ব্ল্যাক হোল যদি শেষ পর্যন্ত একটা বিন্দুর সমান হয়, তার প্রয়োজন হবে একই জায়গায় অনেক জিনিস রাখা। আমাদের পরিচিত সলিড জিনিসগুলো এই কাজ পারে না। ব্ল্যাক হোলের ভিতরে আপনি আমি সব একই জায়গায় একই সময়ে থাকতে হলে উপায় একটাই।

আমাদের ভূতুরে হতে হবে।
হতে হবে বোজোন।

(গাণিতিক প্রমাণগুলো খুবই মজার, সেগুলো থাকবে আমার বইতে। )

(চলবে)

Leave a Reply