কোয়ান্টাম ৩
ফাউন্ডিং ফাদারস
১।
পরীক্ষায় প্রশ্ন আসলো, ব্যারোমিটারের সাহায্যে বিল্ডিং এর উচ্চতা মাপতে হবে। ঘারতেরা ছাত্রের উত্তর, ব্যারোমিটারটাকে সুতায় বেঁধে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক, তারপর সুতা আর ব্যারোমিটারের দৈর্ঘ্য মাপলেই বের হয়ে আসবে বিল্ডিঙের দৈর্ঘ্য।
এই উত্তর দেখে টিচারের মেজাজ মারাত্মক খারাপ হয়ে গেল। ঘারতেরা ছাত্রকে ফেল করানো হোল।
ছাত্রও কম যায় না। সে টিচারের নামে আপিল করে বসলো। উত্তর তো ঠিক আছে, সে জানতে চায় ঠিক কি কারনে তাকে ফেল করানো হোল।
ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিন মহা ফ্যাসাদে পড়ল। একজন নিরপেক্ষ জাজ ঠিক করলো ছাত্র আসলেই পাশ করার যোগ্য নাকি যাচাই করার জন্য।
জাজ বলল, উত্তর ঠিক আছে, কিন্তু এতো বছরের ফিজিক্স শিক্ষা কোন কাজে লেগেছে নাকি সব মাথার উপর দিয়ে গেছে এই উত্তর দেখে বোঝার কোন উপায় নেই। ছাত্রকে ৬ মিনিট সময় দেওয়া হোক, সে প্রমাণ করুক আসলেই কিছু বুঝেছে।
১ মিনিট গেল। ২ মিনিট গেল। ছাত্র ভাবছে তো ভাবছেই, উত্তর নেই। শেষে ১ মিনিট বাকি থাকতে জাজ বলল, ছেলে তোমার কি আসলেই কিছু বলার আছে নাকি ফেল করায় দিবো?
ছাত্র বলল, আসলে তো ব্যারোমিটারের সাহায্যে বিল্ডিঙের উচ্চতা মাপার শত শত উপায় আছে, কি উত্তর দিবো সেটাই ভাবছিলাম।
মানে?
মানে হচ্ছে ধরেন ব্যারোমিটারটাকে ছাদে নিয়ে আছাড় মারা যায়। পড়তে কতক্ষণ লাগে দেখে বের করা যাবে বিল্ডিং এর উচ্চতা।
আপনার গণিত ভালো লাগলে ব্যারোমিটারটাকে মাটিতে বসিয়ে, প্রথমে ব্যারোমিটার আর তার ছায়ার অনুপাত মাপবেন, তারপর মাপবেন বিল্ডিং এর ছায়া, ওইখান থেকে বের হয়ে যাবে বিল্ডিং এর উচ্চতা।
নিজেকে বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী মনে হয়? ব্যারোমিটারটাকে মাটিতে নিয়ে সুতায় বেধে একবার সরল দোলকের মতো দুলান। তারপর ছাদে নিয়ে দুলান। দোলন কালের পার্থক্য থেকে বের হয়ে যাবে উচ্চতা।
…
…
কিন্তু একেবারেই যদি বোরিং, ট্র্যাডিশনাল ওয়েতে চিন্তা করতে হয়, তাহলে আর কি! ব্যারোমিটার একবার মাটিতে নিয়ে বাতাসের চাপ মাপবেন, একবার মাপবেন ছাদে নিয়ে, তারপর দুই চাপের পার্থক্য থেকে বের হয়ে যাবে উচ্চতা।
এই ঘারত্যারা ছাত্রের নাম ছিল নিলস বোর। অসম্ভব ক্রিয়েটিভ মানুষ। আইনস্টাইনের সাথে সামনাসামনি বিজ্ঞান নিয়ে বিতর্ক করার শক্তি খুবই কম মানুষের ছিল, বোর ছিলেন এমন একজন যিনি একবার না, বারবার আইনস্টাইনকে হারিয়েছেন। তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনকদের একজন।

২।
মাত্র ৪ বছর জেনারেল রিলেটিভিটি বের হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ বছরের ১টা ছেলে জেনারেল রিলেটিভিটির উপর পেপার পাবলিশ করে ফেলেছে। ২০ বছর বয়সে তাকে দেওয়া হয়েছে গনিতের এনসাইক্লোপিডিয়া লেখার কাজ। এই ছেলের নাম উলফগ্যাং পলি। ৪র্থ কোয়ান্টাম সংখ্যা আর অপবর্জন নীতি তাকে অমর করে রেখেছে।

২১ বছর বয়সে বিখ্যাত প্রফেসর ম্যাক্স বর্নের অ্যাসিস্ট্যান্ট হন পলি। তারপর তাকে ছেড়ে রওনা দেন বোরের ইন্সটিটিউটে। ম্যাক্স বর্ন তাকে হারিয়ে খুব যে কষ্ট পেয়েছেন বলা যাবে না, কারন ততদিনে পলির প্রায় সমবয়সী, একি রকম মেধাবী আর একজন যোগ দিয়েছে তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে।
ম্যাক্স বর্নের এই নতুন অ্যাসিস্ট্যান্টের নাম ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ। পলি, বর্ন আর হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম থিওরির তিনজন জনক।

৩।
হাইজেনবার্গের চেয়ে মাত্র কয়েক মাসের ছোট পল ডিরাক। ২১ বছর বয়সে ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করেন, চাকরি পাননি। ২৫ বছরের ডিরাক গণিত নিয়ে পড়ছেন। সমবয়সী হাইজেনবার্গ তখন নাম করা বিজ্ঞানী, তাঁর লেকচার শুনতে ভিড় করে আসে মানুষ।
একদিন ডিরাকের কাছে তাঁর টিচার ফাউলার হাইজেনবার্গের একটা পেপার ধরিয়ে দিলেন। হয়ত বললেন, প্রফেসর হাইজেনবার্গের পেপার, দেখ তো কিছু বুঝো নাকি?
বাকিটা ইতিহাস। আস্তে আস্তে বলব।
কোয়ান্টাম থিওরি অনেক মানুষের সমবেত প্রচেষ্টা, কিন্তু ওই থিওরির পেছনে যদি একজন মানুষের নাম মার্ক করে বলতে হয়, সেটা হবে পল ডিরাক। ডিরাক কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির জনক। আন্টিম্যাটারের জনক। ডিরাক ইকুয়েশনের জনক। ফার্মি ডিরাক স্ট্যাটিস্টিকসের অন্যতম জনক। তাকে বলা হয় নিউটনের পর প্রথম ব্রিটিশ বিজ্ঞানী যিনি নিউটনের সমকক্ষ হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।

৪।
১৯২৪ সাল। ঢাকা ভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের এক লেকচারার তাঁর ছাত্রদের বোঝানর চেষ্টা করছেন কিভাবে প্ল্যাঙ্কের থিওরি পরিপূর্ণ না, কিভাবে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ থিওরির কোন রকম সাহায্য ছারা E=hf কে ব্যাখ্যা করা যায়। ৩০ বছরের লেকচারারের ওই ব্যাখ্যা তাঁর ছাত্রদের মাথার উপর দিয়ে গিয়েছিল কিনা জানি না, আইনস্টাইন কিন্তু বুঝেছিলেন।
আইনস্টাইন নিজে তাঁর পেপার জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে পাবলিশ করার ব্যাবস্থা করেন। আর কিছু ইম্প্রুভমেন্টের পর ওই পেপারর নাম হয় বস আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্টিক্স।
বাঙ্গালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোস কোয়ান্টামের আর এক জনক।

৫।
আমরা সম্মানের অযোগ্য ব্যাক্তিদের সম্মান দিয়ে অভ্যস্ত। স্বার্থ হাসিলের জন্য যাকে খুশি তেল দিয়ে আসছি।
এই মানুষগুলো আধুনিক জীবনের জনক। মোবাইল কম্পিউটার ইন্টারনেট ইলেক্ট্রনিক্স সবকিছু এওয়ান্টাম থিওরির অবদান। এই মানুষগুলো কোয়ান্টাম থিওরির জনক।
এদের সম্মান দেওয়ার কথা কোনদিন ভেবেছি কি?
৬।
কালকে সত্যেন বোসের জন্মদিন ছিল।
শুভ জন্মদিন, স্যার!
আশরাফুল ইসলাম
nice and happy to all