৮. পরম ত্বরণ

পরম ত্বরণ

(এই পর্ব অনেকটা ব্রায়ান গ্রিনের বই অবলম্বনে)

আমরা সবাই জানি, বেগ হচ্ছে আপেক্ষিক। আমি তোমার সাপেক্ষে যে বেগে উত্তর দিকে যাবো, তুমি আমার সাপেক্ষে একই বেগে দক্ষিণ দিকে যাবে। আমি রাস্তার সাপেক্ষে ৫ কিলোমিটারবেগে ডানে যাচ্ছি মানে রাস্তা আমার সাপেক্ষে ৫ কিলোমিটার বেগে বামে যাচ্ছে। মহাকাশচারী তার জমজ ভাইকে ছেড়ে অনেক বেগে পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছে, আর পৃথিবী অনেক বেগে মহাকাশচারী থেকে উল্টা দিকে যাচ্ছে একই কথা।

কিন্তু ত্বরণের কি হবে? ত্বরণ নিজেও কি আপেক্ষিক? আমরা যখন ত্বরণ দেই, কার সাপেক্ষে দেই? চলো শুনে আসি ত্বরণের গল্প।

১.

গাড়ি ব্রেক কষলো। সাথে সাথে গাড়ির যাত্রিরা সামনে এগিয়ে যাবে। হয়তো সিটবেল্টে বাঁধা পাবে।

পুরো ব্যাপারটাই হবে তাদের গতি জড়তার জন্য। রাস্তার সাপেক্ষে তাদের বেগ ছিল, তারা সেই বেগের জন্য এগিয়ে যাবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের সাপেক্ষেও তো রাস্তার বেগ ছিল। রাস্তা তো একই বেগে উল্টা দিকে যাচ্ছিল। ব্রেক কষার পর গাড়ির সাপেক্ষে রাস্তার বেগ কমলো, রাস্তা সাপেক্ষে গাড়ির।

তার পরও গাড়ি ব্রেক কষলে কেন গাড়ির মানুষ টের পেলো, রাস্তায় দাঁড়ানো লোকটার কিছুই হলো না? (যদি না ড্রাইভার গাড়ি তার গায়ের উপর তুলে দেয়)

২. 

এইবার ভাবো আরেকটু কম্পলেক্স কাহিনী।

তুমি একটা ড্রোনের উপর ঘুরছো। নিজের অক্ষের চারপাশে গোল করে ঘুরছো। যেহেতু মাটির সাথে তুমি কোনভাবেই লেগে নেই, ঘর্ষণের প্রশ্ন উঠে না। তোমার হাত পা এই ঘুর্ণনের জন্য চার পাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। তোমার মাথা ঘুরছে। একটু পর হয়তো বমি বমি লাগবে।

তোমার মাথার উপরে বসে থাকা উঁকুন কি দেখবে? সে দেখবে, তুমি স্থির আছো, নিচে পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরছে।

এইবার ভাবো, তুমি ড্রোনে স্থির দাঁড়িয়ে আছো। তোমার পায়ের নিচে যে মঞ্চটা আছে সেটা ঘুরছে। মটরের সাহায্যে ঘুরানো হচ্ছে। তোমার মাথার উঁকুনটা কিন্তু এবারও একই জিনিস দেখবে। তুমি স্থির আছো, নিচে বনবন করে দুনিয়া ঘুরছে।

কিন্তু এবার মোটেও তোমার হাত পা চারদিকে ছড়িয়ে যাবে না, মাথা ঘুরবে না, বমি বমিও লাগবে না। তুমি কিছুই ফিল করবা না।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুই সিনারিওর ভেতর পার্থক্য কোথায়? কেন শুধু প্রথম ক্ষেত্রে তুমি ফিল করবা, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে না?

এই ঘটনা যদি স্পেসে দিয়ে ঘটাই কি হবে? তখনও কি তুমি ঘুরলে ফিল করবা? অথচ নিচে পৃথিবী ঘুরলে ফিল করবা না? কেন এরকম হবে?

আর যদি হয়ই, কার সাপেক্ষে ঘুরছো তুমি? নিজের সাপেক্ষে? নিচের পৃথিবীর সাপেক্ষে? এই নিজ কথাটার মানে কি আসলে?


৩.

নিউটন দাবী করেন, যদিও সব বেগ আপেক্ষিক, ত্বরণ আপেক্ষিক না। ত্বরণ পরম। অন্য সব কিছু যদি নাই হয়ে যায়, তুমি যদি মহাশূন্যে যেয়েও ঘুরতে থাকো, তার পরও তোমার হাত পা ছড়িয়ে যাবে, মাথা ভোঁ ভোঁ করবে। 

ত্বরণ হয় আসলে স্পেসের সাপেক্ষে। চারপাশের স্পেস হচ্ছে রিয়েল জিনিস। গাড়ি ব্রেক কষছে স্পেসের সাপেক্ষে। তুমি ঘুরপাক খাচ্ছো স্পেসের সাপেক্ষে।

যার ত্বরণ হবে সে অবশ্যই সেটা ফিল করবে। 

এটা জাস্ট একটা দাবী। এই দাবীর কোন প্রমাণ তার ছিল না। কিন্তু এই দাবী ফেলার উপায়ও নেই কারো।

৪.

নিউটনের বহু বছর পর আর্ন্সট ম্যাচ দাবী করেন, স্পেসের সাপেক্ষে ত্বরণ হচ্ছে এই ধারণা ঠিক না। তিনি বলেন, আমাদের ত্বরণ হচ্ছে চারপাশের ভরের সাপেক্ষে। যেহেতু মহাবিশ্বের সব দিকেই ভরের পরিমান মোটামুটি সমান, গাড়ি ডানে ব্রেক কষলে যাত্রী যেমন ফিল করবে, বামে ব্রেক কষলেও একই জিনিস ফিল করবে।

যদি মহাশূন্য থেকে সব নক্ষত্র, সব গ্রহ সরিয়ে নেওয়া হয়, তারপর তুমি স্পেসে গিয়ে ঘুরতে শুরু করো, তাহলে ম্যাচের মতে তুমি কিছুই ফিল করবা না। তোমার হাত চারপাশে ছড়াবে না। মাথাও বনবন করে ঘুরবে না। যদি অল্প কিছু নক্ষত্র থাকে তাহলে তুমি ত্বরণ ফিল করবা, কিন্তু বেশ অল্প পরিমানে।

এর নাম Mach’s Principle. এই দাবীর সপক্ষেও কোন প্রমাণ নেই।

৫.

গত পর্বে আমরা দেখেছি স্পেস আসলে পরম না। দূরত্ব, ভর সবই গতির সাথে সাথে চেঞ্জ হতে থাকে। তাই যদি হয়, ত্বরণ স্থির স্পেসের সাপেক্ষে হচ্ছে এই কথা বলাটা ভুল। কিন্তু স্পেস একেক জনের সাপেক্ষে একেক রকম হলেও, একটা জিনিস সবার সাপেক্ষে একই থাকে, গত পর্বে আমরা যার নাম দিয়েছিলাম dS. স্পেস টাইমের সাপেক্ষে কারো দূরত্বের নাম ছিল dS.

আইন্সটানের মতে, ত্বরণ হয় আসলে এই স্পেস টাইমের সাপেক্ষে। স্পেস যদিও আপেক্ষিক, সময়ও আপেক্ষিক, কিন্তু স্পেস আর টাইমের এই মিলিত রূপটা পরম। ত্বরণ হয় তার সাপেক্ষেই।

এইবার ভাবো, মহাকাশচারী তার জমজ ভাইকে পৃথিবীতে ফেলে আলোর কাছাকাছি বেগে রওনা দিলো। ফিরে আসার পর দেখা যাবে জমজ ভাইয়ের বয়স বেড়েছে অনেক, কিন্তু তার বয়স বাড়ে নি। বেগ তো সবই আপেক্ষিক। মহাকাশচারী কি এমন করলো যে তার বয়স বাড়লো না, পৃথিবীবাসী জমজ ভাইটার বয়স ঠিকই বাড়লো?

ভাবতে থাকো, খুব দ্রুতই উত্তর দেবো।

৬.

ম্যাচের প্রিন্সিপাল কি আইন্সটাইনের থিওরির সাথে যায়? কিছুটা। ভর সব ত্বরণের জন্য দায়ী না হলেও এক ধরণের ত্বরণের জন্য দায়ী। তার নাম গ্র‍্যাভিটি।

এইবার একটা মজার কথা বলি। আমরা এতক্ষণ দাবী করলাম ত্বরণ ফিল করা যায়। তোমাকে প্লেন থেকে প্যারাসুট ছাড়া ফেলে দিলে তুমি কি আসলে ফিল করবা? হাত কি নিজের থেকে উপরের দিকে উঠে যাবে? চোখ বন্ধ রাখলে, বাতাস না থাকলেও কি তুমি বুঝতে পারবা তুমি আসলে পড়ছ?

উত্তর হচ্ছে না।

কিন্তু, ত্বরণ যার হয় সে তো ফিল করতে পারে। তুমি কেন পারছো না? আসলে কি তোমার ত্বরণ হচ্ছে না।

উত্তর হচ্ছে, না। তোমার ত্বরণ হচ্ছে না।

গাছ থেকে আপেল মাটিতে পড়ে না। উল্টা মাটি ছুটে এসে আপেলকে গ্রহণ করে!!

মজা আসছে 😉                

Nayeem Hossain Faruque

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

৯. ইনট্রিনসিক বক্রতা - ১

Sun May 24 , 2020
Post Views: 831 Facebook0Tweet0Pin0 বহুদিন ধরে লিখছি না, আজ বেশি এনার্জিও নাই, এটা মিনি পর্ব হিসাবেই থাক। আগামীতে ক্লিয়ার করবো।আশা করি যারা ৬, ৭ পড়েছো বুঝবা। ১. একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জসিম দেখলো, আশেপাশে সব বড় হয়ে গেছে। রাস্তা বড়। মানুষজন বড়। গাড়িঘোড়া বড়। আকাশে সূর্য বড়। সে নিজেও […]

Subscribe