৬. মাত্রাতিরিক্ত ঝামেলা ১

মাত্রা নিয়ে চারপাশে হাজারো গুজব। বিন্দুর মাত্রা কয়টা, চতুর্মাত্রিক প্রাণী আছে কি নাই, কয়টা মাত্রা আছে, আমরা অন্য মাত্রায় যেতে পারবো কিনা ইত্যাদি। আজকে সংক্ষেপে কিছু জিনিস ক্লিয়ার করি।

১।

ফিজিক্সে মাত্রা বলতে বুঝায় একটা জায়গার সবগুলো পয়েন্টকে বুঝাতে মিনিমাম কতগুলো অক্ষ লাগবে তাকে। যেমন ধরো একটা গ্রাফ পেপার। গ্রাফ পেপারের উপর ৩টা বিন্দু আছে। একটার অবস্থান (x,y) = (1,3), আরেকটার (4, -1), আরেকটার (7,8)। এই বিন্দুই গ্রাফ পেপারের উপরেই আছে, কোনটাই একটু উপরে আকাশে ভাসছে না। গ্রাফ পেপারের উপরে যে কোন বিন্দুকে আমরা x, y দুইটা অক্ষের সাপেক্ষেই প্রকাশ করতে পারবো। 

প্রথম বিন্দুটার নাম যদি হয় আবুল, তোমাকে যদি বলি, X অক্ষ বরাবর ১ ঘর যাও, তারপর নব্বই ডিগ্রি কোণ করে বেঁকে উত্তর দিকে ৩ ঘর যাও, আবুলকে পেয়ে যাবা। ওই গ্রাফের উপর বসে থাকা সকল আবুল, বাবুল কাবুল, কে কোথায় আছে তুইটা অক্ষের সাপেক্ষেই প্রকাশ করা যায়। তোমার ইচ্ছা হলে z অক্ষ নিতে পারো, যেটা হতে পারে X, Y, Z  এর সাথে লম্ব বরাবর। কিন্তু সবাই যেহেতু ওই গ্রাফ পেপারের উপরেই বসে আছে, Z নেওয়াটা অনর্থক হবে। সবার জন্য Z এর মান একই আসবে, সেটা তুমি সবার জন্য ০ ও ধরতে পারো, ১ ও ধরতে পারো, তোমার ইচ্ছা। কিন্তু তলের উপর কোন কিছুর অবস্থানের জন্য তৃতীয় অক্ষের কোন প্রয়োজন নেই। চাই কি, এই তিন অক্ষের সাথে লম্ব বরাবর আরেকটা K অক্ষও ধরতে পারো, সেটাও সবার জন্যই একই আসবে। অযথা ঝামেলা না বাড়ালেই চলে।

আমি বারবার লম্ব কথাটা উল্লেখ করছি, এতে করে যাতে কারো মনে আবার ধারনা গেঁথে না বসে অক্ষগুলো লম্ব বরাবরই হতে হবে। এমন হতেই পারে, x,y না, n,m অক্ষ নিলাম, এরা একে অপরের সাথে ৪৫ ডিগ্রি কোণে আছে। আবার কার্টেসিয়ান সিস্টেম বাদ দিয়ে আমি ইচ্ছা করলে পোলার সিস্টেমও নিতে পারি। একটা বৃত্ত ভাবলাম, কোন একটা কোণ ঠিক করলাম, তারপর ওই কোণ ধরে ব্যাসার্ধ বরাবর গেলাম। সেক্ষেত্রে আমাদের অক্ষ হবে r, θ. তকন আমরা বলব, উত্তর দিকের সাথে ৭১ ডিগ্রি কোণে মূলবিন্দু থেকে মোটামুটি ৩.১৬ মিটার দূরে আবুল বসে আছে।

যদি কোন একটা কো অর্ডিনেট সিস্টেমের জন্য একটা জায়গার সকল বিন্দু মাত্র দুইটা অক্ষের সাহায্যেই বোঝানো যায়, তাহলে সেই জায়গাটা দ্বিমাত্রিক। প্রতিটা দল দ্বিমাত্রিক। যদি আমি গ্রাপ পেপার বাঁকাই, ভাজ করি তার পরও সেটা দ্বিমাত্রিক থাকবে। কারন কিভাবে ভাঁজ হয়েছে সেটা তো দেখার ব্যাপার না, আমি হাঁটবো গ্রাফ পেপার বরাবর, একটা পিঁপড়া যেভাবে হাঁটে। ওই পেপারের বাইরে কি হচ্ছে সেটা আমার জানার দরকার নেই।

এমনকি পৃথিবী পৃষ্ট নিজেও দ্বিমাত্রিক। সেখানে কোন কিছুর অবস্থান বের করার জন্য আমাদের মাত্র দুইটা অক্ষের দরকার হয়, সাধারণত কনভেনশন হচ্ছে এই অক্ষগুলো অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ। তুমি পাহাড়ে থাকো আর গর্তে থাকো, এই দুটো জানলেই আমি তোমাকে পৃষ্ট বরাবর হেঁটে ঠিক খুঁজে বের করবো।

২.

এইবার ধরো, মাত্র দুইটা অক্ষে হচ্ছে না। আমাদের হিসাবে আনতে হবে আকাশে আক্কাস আলীর প্লেন কোন জায়গায় আছে, পানির নিচে কোন ইলিশ মাছ কোথায় লাফালাফি করছে। এখন আমাদের দরকার হবে তিনটা অক্ষের। X, Y আর Z. অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, উচ্চতা। যেভাবেই হোক না কেন।

আমাদের জগত এতদিন আমরা ত্রিমাত্রিক জানতাম। কমন সেন্স তাই বলে। আমাদের শরীর ত্রিমাত্রিক। আমাদের শরীরের প্রতিটা অণু কোনটা কোন জায়গায় আছে বোঝাতে হলে দুইটা অক্ষ ব্যবহার করলে হয় না। বুকের বা পাশে হার্টের অলিন্দের ভেতর যে লোহিত রক্তকণিকাটা ছটফট করে ভালোবাসা জানান দিচ্ছে, তার অবস্থানের জন্য আমাদের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা- তিনটা মাত্রা দরকার হয়। কিন্তু বক্রিনা আপুর চামড়ার উপরের কোন তিল কোন জায়গায় আছে, সেটা বোঝানোর জন্য দুইটা মাত্রাই যথেষ্ট। খেয়াল করো, চামড়ার উপরের তলটা দ্বিমাত্রিক, চামড়া কিন্তু নিজে ত্রিমাত্রিক।

আমাদের জান মতে কোন বাস্তব দ্বিমাত্রিক বস্তু নেই। দ্বিমাত্রিক প্রাণী নেই। একটা প্রাণী যদি প্রচণ্ড চ্যাপ্টাও হয়ে থাকে, তার একটু হলেও উচ্চতা আছে। তার শরীরের প্রতিটা অণু পরমাণুকে আমরা দুই অক্ষ দিয়ে বোঝাতে পারবো না, এমনকি অণূ পরমাণূ, মৌলিক কণা এরা নিজেরাও ত্রিমাত্রিক।

৩.

একটা ঘনবস্তু ত্রিমাত্রিক জিনিস। যেমন ধরো একটা কিউব। দুইটা কিউবের ছেদ হচ্ছে একটা দ্বিমাত্রিক তল। সেটা দ্বিমাত্রিক জিনিস। দুইটা তলের ছেদ হচ্ছে একটা একমাত্রিক রেখা, সরল হোক আর বক্র। যেমন দুইটা বর্গ একে অপরকে রেখা বরাবর ছেদ করবে। আর দুইটা রেখা একে অপরকে ছেদ করবে বিন্দু বরাবর। যার কিনা মাত্রা শূন্য। বিন্দুদতে হাটাহাটির কিছু নেই জন্য তার মাত্রা শূন্য, তাকে প্রকাশ করতে কোন অক্ষ লাগে না। আমরা কাগজে ফঁটা দিয়ে যা আঁকি সেটা বিন্দুর ছবি, আদর্শ বিন্দু কোনদিন আঁকা সম্ভব না। আদর্শ রেখাও না।

এইবার ভাবো, এমন একটা জিনিস আছে, যেটা দুইটা একে অপরকে ছেদ করলে ওই ছেদের জায়গাটা হবে একটা কিউব। এরকম জিনিসের নিজের মাত্রা হবে চারটা চারটা। এই জিনিসের প্রতিটা বিন্দুকে বোঝাতে স্পেসের চারটা মাত্রা লাগবে। ধরো X, তার সাথে লম্ব বরাবর Y, XY তলের সাথে লম্ব বরাবর Z, আর X,Y,Z তিনটার সাথেই লম্ব বরাবর K. এরকম জিনিস হবে চতুর্মাত্রিক বস্তু। কিউবের চারমাত্রিক বড় ভাইয়ের নাম হচ্ছে টেসার‍্যাক্ট। রাইট, টেসার‍্যাক্ট মারভেল কমিক্সের জিনিস না, আসল টেসার‍্যাক্ট ফিজিক্সের একটা চমৎকার জিনিস। মাত্রা নিইয়ে পর্ব দুই করার ইচ্ছা আছে, তখন এ নিয়ে আরো লিখবো।

Lovecraft GIF - Find & Share on GIPHY

৪.

একটু চোখ বন্ধ করো, ভাবো স্পেস আসলে কোয়ান্টাইজড। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব আছে (হতে পারে সেটা প্ল্যাঙ্কের দৈর্ঘ্য), এর চেয়ে ছোট কিছু সম্ভব না। আবার আগ বাড়িয়ে ভেবে বোস না প্ল্যাঙ্কের দৈর্ঘ্য আসলেই সবচেয়ে ছোট দূরত্ব, এটা এখনও প্রমাণিত না। যাই হোক, যদি আসলেই এমন কিছু থেকে থাকে, আর যদি ধরো অক্ষগুলো সসীম, তাহলে তো ভাবাই যায়, চাদর ভাঁজ করার মতো একটা তল কিছুদূর যেয়ে নিজের উপরই ভাঁজ হয়ে এসেছে। তাই যদি হয়, প্রতিটা বিন্দুকে আসলে ওই চাদরের উপর দুইটা স্থানঙ্ক দিয়েই প্রকাশ করা যায়।

চাদরের উপরের পৃষ্টটা দ্বিমাত্রিক। সেক্ষেত্রে আমরা হবো আসলে দ্বিমাত্রিক প্রাণী!

আগামী পর্বেঃ

তিনের বেশি মাত্রা কি আসলেই আছে? সময় কেন মাত্রা? আর কোন মাত্রা থাকলে সেগুলো কিভাবে আছে?

Nayeem Hossain Faruque

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

৭. মাত্রাতিরিক্ত ঝামেলা ২: সময় কেন মাত্রা

Tue Apr 28 , 2020
Post Views: 772 Facebook0Tweet0Pin0 আগের পর্ব ঠিক যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকেই শুরু করছি। না পড়ে থাকলে পড়ে আসতে পারো। ১. মাত্রা জিনিসটা শুধু যে কে কোন অবস্থানে আছে সেটাই বোঝায় না, এটা দিয়ে দুইটা পয়েন্টের দূরত্ব বের করা যায়। যেমন গ্রাফ পেপারে আবুল যদি থাকে (1,3) বিন্দুতে, বাবুল যদি […]

Subscribe