৪. রস কষহীন ভূমিকা


 

জেনারেল রিলেটিভিটি নিয়ে তিন পর্ব লিখে ফেলেছি, অথচ ভূমিকাই দেই নি। মহা অন্যায় হয়ে গেছে। এই পর্বে শুধু দুই চার কথায় ভূমিকা হবে, আর কিছু হবে না। 

কোন কিছুরই বিস্তারিততে যাবো না, সেটা সামনে থাকবে। 

১. আলোর বেগকে অতিক্রম করা যায় না, তাই আলোর বেগের কাছাকাছি গেলে পর্যবেক্ষক সাপেক্ষে সময় ধীর হয়ে যায়, স্থান ছোট হয়ে যায়। এই ঘটনার নাম স্পেশাল রিলেটিভিটি। এ নিয়ে আগেও লিখেছিলাম, চা কফি আর কোয়ান্টাম মেকানিক্স বইয়ে আছে।   

২. যেহেতু দূরত্ব আসলে absolute না, সেটা বেগের সাথে, পর্যবেক্ষক সাপেক্ষে সময়ের সাপেক্ষে চেঞ্জ হয় তাই দূরত্ব আর সময় এক করে বলা হয় স্পেস টাইম। সময়কে ধরা হয় চার নাম্বার মাত্রা।

৩. আইন্সটাইন বুঝতে পারেন, মহাকর্ষের ফিল্ড কেবলই একটা ত্বরণ, আর এই ত্বরণের জন্যও আসলে স্পেস টাইম চেঞ্জ হবে। মহাকর্ষ ফিল্ড কেবলই একটা ত্বরণ এই উপলব্ধির নাম উইক ইকুইভ্যালেন্স প্রিন্সিপল।

৪. একটা রাস্তা দিয়ে গেলে স্কেল ছোট হয়ে যায়, একে চিন্তা করা যায় এভাবে যে রাস্তা আসলে লম্বা হয়ে গেছে। রাস্তা আসলে লম্বা হয়ে গেছে এটা চিন্তা করার উপায় হচ্ছে রাস্তা বেঁকে গেছে কোনভাবে। যদিও আসলে বাঁকতে দেখছি না, ধরা যায় অন্য কোন ডাইমেনশনে বেঁকেছে। সেই সাথে সময়ও স্লো/ফাস্ট হচ্ছে। এই জিনিসকে একসাথে বলে স্পেস টাইমের বক্রতা।

৫. রেস্ট মাস, ভরবেগ, মোট শক্তি এরকম বেশ কিছু জিনিস এভাবে স্পেস টাইমকে বাঁকায়। এদের একত্রে বলে স্ট্রেস এনার্জি টেনসর। 

৬. পৃথিবীর উপর দিয়ে প্লেনে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেলে আমরা সরলরেখায় যাই না, সম্ভাব্য সবচেয়ে সরল পথে চলি। একেবারে সরল রেখায় গেলে মাটি ফুটা করে যেতে হতো। কোন বস্তু সরলেরেখায় চলতে গেলেও আসলে স্পেস টাইমের এই তথাকথিত বক্রতাকে ফলো করে চলে। এভাবে চলতে যেয়ে তার যে পথ সেটাকে বলে জিওডেসিক।

৭. জিওডেসিকে চলার সময় পথের বক্রতার জন্য দুই বিন্দুর দূরত্ব আসলে প্লেইন পীথাগোরাস দিয়ে বের করা যায় না, মেট্রিক টেন্সর লাগে। এটা আগের পর্বে একটু একটু বলেছি।

৮. কোন বস্তু জিওডেসিকে চলছে কিনা সেটা বুঝা যায় কতগুলো চিহ্নের মান ০ কিনা দেখে। এদেরকে বলা হয় ক্রিস্টোফেল সিম্বোল।

৯. যেহেতু স্পেস টাইমের বাইরে যেয়ে আমরা মাপতে পারছি না আসলেই কিছু বেঁকেছে কিনা, আমাদের ভেতরে বসেই বক্রতা মাপতে হচ্ছে। এই জন্য জটিল কিছু সমীকরণ ব্যবহার করা হয়। তার একটা ধাপ হচ্ছে একটা তীরকে গোল করে ঘুরিয়ে এনে দেখা, আগের অবস্তগান থেকে তার কোণ কয়টুকু পরিবর্তন হয়েছে। এই জিনিস মাপার উপায় হচ্ছে রিম্যান কার্ভেচার টেন্সর।

১০. অনেকগুলো রিম্যান কার্ভেচার টেন্সর একসাথে হিসাব করে মাপা যায় জিওডেসিকের উপর দিয়ে চলতে গেলে কোন জিনিসের আয়তন কিরকম পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিমাপের নাম রিচি টেন্সর। 

১১. রিচি টেন্সর, সেই সাথে আরেকটা জিনিস, রিচি স্কেলার, মাপে হচ্ছে স্পেসে কতটুকু বেঁকে আছে। দুইটাকে একসাথে বলে আইন্সটাইন টেন্সর।

১২. কিছু একটা অজানা জিনিস স্পেসের এই বক্রতাকে বাঁধা দেয়, স্পেসকে টেনে বড় করার চেষ্টা করে। এর নাম হচ্ছে কসমোলজিক্যাল কন্সট্যান্ট, অপর নাম ডার্ক এনার্জি।

১৩. আইন্সটাইন দশ বছর ধরে গবেষণা করে বামপক্ষে আইন্সটাইন টেন্সরের সাথে কসমোলজিক্যাল কন্সট্যান্ট যোগ করে ডানে স্ট্রেস এনার্জি টেনসরের সমান করে একটা সমীকরণ দিয়েছেন। এই সমীকরণের নাম আইন্সটাইন ফিল্ড ইকুয়েশন। এটা আইন্সটাইনের জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি।

১৪. এই সমীকরণ সমাধান করে আসে কোন জায়গায় স্পেস কতটা বাঁকবে। নরমাল নক্ষত্র, ব্ল্যাক হোল, বিগ ব্যাং সব কিছুই এই সমীকরণ থেকে আসে। অল্প বেগ, অল্প ভরের জন্য এই সমীকরণ আমাদের পরিচিত নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে রূপ নেয়।

১৫. ব্ল্যাক হোলের জন্য আইন্সটাইন ফিল্ড ইকুয়েশনের সমাধানের নাম শোয়ার্জশিল্ড মেট্রিক। এখান থেকে ব্ল্যাক হোলের অসীম বক্রতার ধারণা আসে।

আশা করি, পুরোটাই মাথার উপর দিয়ে গেছে। আমরা এই সিরিজে, অথবা সামনে বই আসলে তাতে এসব জিনিস আস্তে আস্তে ক্লিয়ার হবো, যতদূর সম্ভব।

Nayeem Hossain Faruque

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

ভূমিকা

Tue Apr 28 , 2020
Post Views: 964 Facebook0Tweet0Pin0 পৃথিবী ঘুরে কেন? আমি হলে এভাবে বুঝাতাম – বহু বহুদিন আগে, সৌরজগতের শুরুতে, সবাই যে যার মতো একেকজন একেক দিকে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ সোজা সূর্যের দিকে রওনা দিলো, তারা সূর্যে গিয়ে পড়লো। কেউ কেউ রওনা দিলো সূর্যের উলটা দিকে, তাদের কেউ কেউ সৌরজগত থেকে বের হয়ে […]

Subscribe