ভূমিকা

পৃথিবী ঘুরে কেন?

আমি হলে এভাবে বুঝাতাম – বহু বহুদিন আগে, সৌরজগতের শুরুতে, সবাই যে যার মতো একেকজন একেক দিকে যাচ্ছিলো। কেউ কেউ সোজা সূর্যের দিকে রওনা দিলো, তারা সূর্যে গিয়ে পড়লো। কেউ কেউ রওনা দিলো সূর্যের উলটা দিকে, তাদের কেউ কেউ সৌরজগত থেকে বের হয়ে গেল, কেউ অন্য গ্রহে যেয়ে পড়লো।

পৃথিবী বেচারী সূর্যের চারপাশে চলছিলো মোটামুটি স্পর্শক বরাবর, নির্দিষ্ট বেগে। সূর্য তাকে টান দিয়ে একটু নামায়, কিন্তু বেগের জন্য সে আবার আরও কিছুটা দূরে এগিয়ে যায়। আবার টান দেয়, আবার সে সামনে আগায়। ঠিক যেন খুঁটির চারপাশে একটা ছাগল ঘুরছে, সে একটু আগায়, দড়িতে টান পরে, মাথে একটু ঘুরে যায়, আবার সে আগায়। সহজ স্বাভাবিক জিনিস। 

মহান বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন আজ থেকে সাড়ে তিনশ বছর আগে এই অতি সুন্দর, স্বাভাবিক ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন – একটা স্কুল কলেজের ছেলের উচিত সবার আগে এই ব্যাখ্যাটা অন্তর দিয়ে বোঝা।

তারা সেটা করে না। কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করি, পৃথিবী ঘোরে কেন, প্রায়ই উত্তর পাই, স্পেস টাইমের নাকি একটা চাদর আছে, সেই চাদরে ছড়িয়ে দেওয়া বলের মত পৃথিবী চলছে। চাদরটা বেঁকে আছে, আর সেই বক্রতাই পৃথিবীকে ঘোরাচ্ছে। তারপর যদি জিজ্ঞাসা করি, কি এই চাদর? কই আছে? কিভাবেই বা বেঁকে আছে? বেঁকেই যদি থাকে তাঁর সাথে পৃথিবীর ঘোরার কি সম্পর্ক? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর কোন উত্তর আসে না, থাকলেও বোঝা যায় আসলে কিছু জানে না সে। পপ সায়েন্স খুব ভালো জিনিস, কিন্তু তাঁর মারাত্মক কিছু ক্ষতিকর দিক আছে, তার মধ্যে একটা হচ্ছে সহজ, সাধারণ জিনিসগুলোকে ভালোভাবে না বুঝে অযথা জটিল জিনিসে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

তারপরও, স্পেস টাইমের চাদর কিন্তু আসলে ভুল নয়, যদিও সেটা একটা জটিল জিনিসকে অতি সহজে বোঝানোর চেষ্টা। মহামতি আইন্সটাইন দশ বছর পরিশ্রম করে, পাথার ঘাম পায়ে ফেলে, মাথার কোঁকড়া লম্বা চুল টেনে ছিড়ে ফেলে অবশেষে প্রমাণ করেছেন নিউটনের সহজ সাধারণ মহাকর্ষ সূত্র আসলে ঠিক নয়। F = GMm/d^2 এটা কেবলই একটা জটিল জিনিসের সহজ অবস্থায় সমাধান। আমরা যেমন বলি, ৪ ডিগ্রির কম কোণের সাইন থিটা = থিটা, কিন্তু যে কোন কোণের জন্য সেটা সত্যি নয় – নিউটনের সূত্রও সেরকম। সেটা আসল সূত্র নয়, তবে বেগ খুব বেশি না হলে, ঘনত্ব মারাত্মক না হলে সেটা চমৎকার কাজ করে। 

সূর্য যখন ছোট হয়ে হোয়াইট ডোয়ার্ফ হয়ে যাবে, যার এক চামচের ওজন হবে পনেরো টনের মতো, সেই অস্বাভাবিক ঘনত্বের জিনিসের পৃষ্ঠদেশে নিউটনের সূত্র আর ভালো কাজ করবে না। বিশাল দানব তারা মরার পর যখন নিউট্রন স্টার হব, আর তার এক চামচের ওজন হবে দশ মিলিয়ন টন, তার কাছে নিউটনের সূত্র আরও বেশি করে ভুল করবে। সুবিশাল নক্ষত্র মৃত্যুর পর চুপশে যেয়ে যখন সম্ভবত শূন্য আয়তনের ব্ল্যাক হোল হয়ে যাবে, সেই অস্বাভাবিক, অবাস্তব জিনিসের কাছেও নিউটনের সূত্র টিকবে না। 

তখন আমাদের প্রয়োজন হবে আইন্সটাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির। যেটা কিনা স্পেশাল বড় ভাই। যেটা এমন এক জগতের বর্ণনা করে যেখানে সময় ধীর হয়ে যায়, ঘড়ির কাটা থেমে যায়। যেখানে স্পেস ছোট হয়ে যায়, যেই জগতে একটা এক ফুট চওড়া ঘরের ভেতর দিকটা দশ ফুট চওড়া হয়ে যায়। যে জগতে বেগের উপর নির্ভর করে তোমার আমার বর্তমান, যেখানে বাবার চেয়ে মেয়ের বয়স বেশি হতে পারে। এই চূড়ান্ত অবাস্তব, অসম্ভব জগতে স্পেস টাইম আসলেই একটা চাদরের মতো, কিন্তু আমাদের পরিচিত নিত্যদিনের চাদরের সাথে এর কোন মিল নেই – সেই চাদর চতুর্মাত্রিক চাদর।


জেনারেল রিলেটিভিটির সেই অবাস্তব জগতে গ্র‍্যাভিটি হচ্ছে আসলে স্পেস টাইমের সেই চাদরের বক্রতা, নিউটনের মতো সহজ স্বাভাবিক কোন বল নয়। যে অতি জটিল সমীকরণ এই বক্রতার বর্ণনা দেয় তার নাম হচ্ছে আইন্সটাইন ফিল্ড ইকুয়েশন। তথাকথিত এই চতুর্মাত্রিক চাদর যখন ‘খাড়া’ বেঁকে যায়, তখন আমরা সেটাকে তলাহীন গভীর কূপের সাথে তুলনা করে নাম দেই ব্ল্যাক হোল। যখন চাদর ‘ফুটা’ করে বহু দূরের কোন গ্রহে এক মুহূর্তে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, আমরা তার নাম দেই ওয়ার্মহোল। যখন চাদর উল্টে পাল্টে অতীতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, আমরা তার নাম দেই টাইম মেশিন। যে জিনিস এই তথাকথিত চাদরকে বাঁকাচ্ছে সেটা হচ্ছে ভর, সাথে আরও অনেক কিছু। এই ভরের বেশিরভাগ জিনিস আসে রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার থেকে। আর যে ভৌতিক জিনিস ওই ভরের বিপরীতে কাজ করে স্পেস টাইমের চাদরকে টেনে লম্বা করার চেষ্টা করছে তার নাম হচ্ছে ডার্ক এনার্জি। 

আর সবার আগে, সবকিছুর আগে, ওই চাদরটা যখন অতি ক্ষুদ্র হয়ে কুঁকড়ে ছিল, তারপর বড় হওয়া শুরু করে – সেই ঘটনার নাম আমরা দেই বিগ ব্যাং।

এই সিরিজে আমরা মাত্রা, স্পেশাল রিলেটিভিট, বক্রতা বুঝে একটু একটু করে ঢুকে যাবো আইন্সটাইনের রহস্যময় সমীকরণের জগতে। আমরা বুঝবো এই চাদর আসলে কি জিনিস, চাদদের নামে আসলে কি হচ্ছে। আমরা দেখবো বক্রতার মানে কি আসলে, ঠিক কি বাঁকে। মহামতি রিম্যান খাতা কলম নিয়ে এসে আমাদের একটু একটু করে বুঝাবেন বহুমাত্রিক জগৎ। গণিতবিদ ক্রিস্টোফেল শেখাবেন বক্রতা মাপার উপায়। গ্রেগোরিও রিচি কালো ব্ল্যাকবোর্ড ভরে বড় বড় করে লিখবেন রিচি টেন্সরের কাহিনী। আর এই সবকিছু মিলে আইন্সটাইন সাজাবেন তার রহস্যময় ফিল্ড ইকুয়েশন।

সেটার সমাধান করে আমরা ঢুকে যাবো ব্ল্যাক হোলের অতলে। পদার্থবিদ শোয়ার্জশিল্ড আমাদের বোঝাবেন ব্ল্যাক হোল কি এবং কেন, সেটা ভেতর থেকে আর বাইরে থেকে কিরকম, তুমি যদি আসলেই ব্ল্যাক হোলের অন্ধকূপে ঝাঁপ দাও ঠিক কি দেখবে। আমরা দেখে আসবো কি করলে এই স্পেস টাইমের চাদর ফুটা করা যায়, টাইম মেশিন আসলে কতটা সম্ভব। বুঝে ফেলবো ঠিক কিভাবে ডার্ক এনার্জি টেনে টেনে স্পেস টাইমের চাদর লম্বা করছে।

এই সব কিছু শেষ করে আমরা তাকাবো সুদূর অতীতে, তেরোশো আশি কোটি বছর আগের মহাবিশ্বে।

তখন বিগ ব্যাং হচ্ছে।

আমরা বিগ ব্যাং দেখবো।

Nayeem Hossain Faruque

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

৬. মাত্রাতিরিক্ত ঝামেলা ১

Tue Apr 28 , 2020
Post Views: 790 Facebook0Tweet0Pin0 মাত্রা নিয়ে চারপাশে হাজারো গুজব। বিন্দুর মাত্রা কয়টা, চতুর্মাত্রিক প্রাণী আছে কি নাই, কয়টা মাত্রা আছে, আমরা অন্য মাত্রায় যেতে পারবো কিনা ইত্যাদি। আজকে সংক্ষেপে কিছু জিনিস ক্লিয়ার করি। ১। ফিজিক্সে মাত্রা বলতে বুঝায় একটা জায়গার সবগুলো পয়েন্টকে বুঝাতে মিনিমাম কতগুলো অক্ষ লাগবে তাকে। যেমন ধরো […]

Subscribe