কোয়ান্টাম ৫০: এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট ১

কোয়ান্টাম ৫০
এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট ১

১।
১৯৩৫ সাল।
আইনস্টাইনের বয়স এখন ৫৭ বছর।
তাঁর ঝাঁকড়া চুলে পাক ধরেছে, কপালে দেখা দিয়েছে বয়সের বলিরেখা।
সুইজারল্যান্ডের প্যাটেন্ট অফিসের সেই অখ্যাত কেরানী আজ বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী। নিউটনের সূত্রকে তিনি তছনছ করে ফেলেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন স্থান কাল পরম নয়, আমার সময় আপনার সময় এক নয়।
তাঁর সূত্র থেকে উঠে এসেছে বিগ ব্যাঙের কাহিনী, স্থান কালের বক্রতা, কৃষ্ণ বিবরের সিঙ্গুলারিটি।
যেসব জিনিস মানুষ কল্পনাও করতে পারত না, তিনি সেগুলো প্রমাণ করে ছেড়েছেন কিভাবে সম্ভব।
অদ্ভুতুড়ে জিনিস দেখে তিনি অভ্যস্ত।

সেই আইনস্টাইন এখন চিন্তিত, বিভ্রান্ত। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভয়াবহ জিনিসগুলো তিনি কিছুতেই মানতে পারছেন না।
আমরা দেখার আগ পর্যন্ত একটা কণা নিজেই জানে না সে কোথায় কোন ভরবেগে আছে, এটা একেবারেই অসম্ভব।
নিশ্চয়ই কণার পেটের মধ্যে গোপন কিছু আছে, সে আসলে জানে তাকে কোথায় দেখা দিতে হবে।
এটা সম্ভব না যে আমরা মাপার পর কণা ঠিক করবে সে কিভাবে কোন স্টেটে যাবে।
শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল দেখার আগ পর্যন্ত জীবন মৃত্যুর সুপারপজিশনে আছে, এটা হতে পারে না। ভেতরে ভেতরে সে ঠিকই জানে সে বেঁচে আচে না মরে গেছে।

আইনস্টাইন তাঁর দুই কলিগ রোজেন আর পডলস্কিকে সাথে নিয়ে লিখে ফেললেন তাদের বিখ্যাত পেপার “Can Quantum-Mechanical Description of Physical Reality be Considered Complete?” সেখানে যুক্তি দেখালেনঃ
মনে কর, শূন্য থেকে শক্তি দিয়ে একজোড়া কণার জন্ম হলো। জন্মের আগে এদের মোট ভরবেগ ছিল শূন্য। ভরবেগ সংরক্ষিত থাকে। তাই এখনও এদের মোট ভরবেগ শূন্য থাকবে।
একটা কণার ভরবেগ যদি হয় ৫, আরেকটা হতেই হবে -৫।
একটার ভরবেগ জানলে আমরা আরেকটার ভরবেগ জেনে যাবো।
এই কনাদুটার নাম এন্ট্যাঙ্গেল্ড কণা।
এরা একে অপরের ভাই। ঝগড়াটে যমজ ভাই। একজন হাসলে আরেকজন কাঁদে।

কোয়ান্টাম কণাগুলো থাকে অনেকগুলো স্টেটের সুপারপজিশন হিসাবে।
মাপার আগ পর্যন্ত ধরি কণাগুলো ছিল ৫টা ভরবেগের সুপারপজিশন অবস্থায়। ১, ২, ৩, ৪, ৫।
একিভাবে, কণাগুলোর অবস্থানও মাপার আগ পর্যন্ত ছিল সুপারপজিশন অবস্থায়। ধরি মাপার আগ পর্যন্ত একটা কণার দূরত্ব ছিল যে পয়েন্ট থেকে তাঁর জন্ম হয়েছিল সেখান থেকে ১o, ২o, ৩o, ৪০, ৫০ মিটার।

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র অনুযায়ী, যে মুহূর্তে আমি জেনে যাবো কণার ভরবেগ নিশ্চিতভাবে ৫, সাথে সাথে তাঁর অবস্থান হয়ে যাবে পুরাপুরি অনিশ্চিত।
ভরবেগের ওয়েভ ফাংশন কল্যাপ্স করা মাত্র অবস্থানের ওয়েভ ফাংশন বিশাল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। (বিস্তারিত কোয়ান্টাম ২৪, ২৫)

আইনস্টাইন বললেন, অনিশ্চয়তাকে বিট দেওয়া যায়। কিভাবে?
আমি আমার কণাকে না মেপে মাপবো তাঁর যমজ ভাইকে। তাকে মাপলে তাঁর ওয়েভ ফাংশন কল্যাপ্স করবে। আমি তার ভরবেগ থেকে জেনে যাবো আমার কণাটার ভরবেগ।
তাকে যখন মাপবো সে আমার কণা থেকে এক আলোকবর্ষ দূরে থাকতে পারে।
তার যে ওয়েভ ফাংশন কল্যাপ্স করেছে সেটা আমার কণাটার কোনভাবেই জানা সম্ভব না। অন্তত এক বছরের আগে না। আলোর চেয়ে বেশি বেগে যোগাযোগ করা সম্ভব না।
তাই যদিও আমি আমার কণাটার ভরবেগ জেনে গেছি, তার অবস্থান অনিশ্চিত হয় নি এখনও।
এইবার যদি আমি আমার কণাটার অবস্থান মাপি, সেটা নিশ্চিত একটা মান দিবে।
তাহলে, আমি একই সাথে আমার কণার অবস্থান আর ভরবেগ জানতে পারছি।

তাহলে অনিশ্চয়তা সূত্র পুরোপুরি ঠিক না।
নিশ্চয়য়ই কণার মধ্যে গোপন কোন তথ্য আছে।
সে আগে থেকেই জানে তাকে কোথায় দেখা দিতে হবে।

এই জিনিস হওয়ার মানে নিলস বোরের আইডিয়া ঠিক না। কোপেনহ্যাগেন ইন্টারপ্রিটেশান ভুল। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে রহস্যময় কিছু নেই।

নীলস বোর শেয়ালের মতো চালাক। তিনি বারবার আইনস্টাইনকে হারিয়েছেন একের পর এক ডিবেটে। এবারও তিনি হার মানার পাত্র নন।
পাঁচ মাস পরে, বোর একই নামে একটা পেপার পাবলিশ করলেন।
তিনি দাবী করলেন, তার পরও ঝগড়াটে যমজ ভাই তার ভাইকে কোনভাবে তথ্য পাঠাতে পারে, যেটার ফলাফল পরে মাপতে গেলে ধরা পড়বে। নীলসবোরের জবাব সরাসরি তুলে দিলামঃ

“The statement of the criterion in question is ambiguous with regard to the expression “without disturbing the system in any way”. Naturally, in this case no mechanical disturbance of the system under examination can take place in the crucial stage of the process of measurement. But even in this stage there arises the essential problem of an influence on the precise conditions which define the possible types of prediction which regard the subsequent behaviour of the system…their arguments do not justify their conclusion that the quantum description turns out to be essentially incomplete…This description can be characterized as a rational use of the possibilities of an unambiguous interpretation of the process of measurement compatible with the finite and uncontrollable interaction between the object and the instrument of measurement in the context of quantum theory.”

২।
আইনস্টাইন বোরের জবাব মেনে নেন নি। তিনি সারা জীবন চেষ্টা করে গেছেন কণার পেটের ভেতর লুকিয়ে থাকা গোপন কথাগুলো খুঁজে বের করতে। পারেন নি।
আইনস্টাইন মারা যান ১৯৫৫ সালে, হয়তো একরাশ অতৃপ্তি নিয়ে।
সাত বছর পর ১৯৬২ সালে বোর মারা যান। নীলস বোরের মৃত্যুর পর তার ঘরে পাওয়া যায় প্রতিপক্ষ আইনস্টাইনের সাথে বিতর্কগুলো নিয়ে আঁকা ডায়াগ্রাম। সাড়া জীবন তিনি অস্বস্তিতে ছিলেন, যে যুক্তিগুলো দিয়ে তিনি আইন্সটাইনকে হারিয়েছিলেন সেগুলো ঠিক ছিল কিনা।

তারও দুই বছর পর স্ট্যানফোর্ডের প্রফেসর জন বেল উপায় বাতলে দিলেন কিভাবে বুঝতে হবে কে ঠিক ছিল, আইনস্টাইন না বোর। বেলের ওই বিখ্যাত সূত্রের নাম বেলের অসমতা, এটা যদি কোনদিন ভঙ্গ হয় বুঝতে হবে কণা আসলেই আগে থেকে জানে না তার নিজের স্টেট।

বুঝতে হবে এক আলোকবর্ষ দূরের জমজ ভাইটা আসলেই কোন এক জাদুবলে মুহূর্তের মধ্যে মেসেজ পাঠায় তার জমজ ভাইকে।
সাথে সাথে বহু দূরের কনাটার ভরবেগের ওয়েভ ফাংশন কল্যাপ্স করে, টিকে যায় হাইজেনবার্গের সূত্র।

৩।
বিজ্ঞানীরা মাপ্লেন। বহুবার, বহু উপায়ে।

আইন্সটাইন ভুল করেছিলেন। নীলস বোর ঠিক বলেছিলেন।
বেলের অসমতা ভঙ্গ হয়েছে।
ভয়ংকর কিছু অবশ্যই ঘটেছে!

আগামী পর্বে এই জিনিস বুঝানোর জন্য আপনাদের সামনে হাজির হচ্ছেন বক্কর ভাই।

Nayeem Hossain Faruque

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

কোয়ান্টাম ৫১: এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট ২

Thu Oct 17 , 2019
Post Views: 972 Facebook0Tweet0Pin0 কোয়ান্টাম ৫১  এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট ২  ১।  বক্কর ভাইয়ের গার্ল ফ্রেন্ডের নাম লক্কড়।  আধুনিক বাংলা নাম।  বাড়ি তার লুব্ধক নক্ষত্রের কাছাকাছি একটা গ্রহে। সেখানে এরকম নামই চলে।  কয়েকদিন আগে বক্করভাই লুব্ধকের ওদিকে গিয়েছিলো, ফেরার সময় লক্কর আপু তাকে এক বাক্স কয়েন গিফট করে। বক্কর ভাই টাকা পয়সাকে অন্য […]

Subscribe