১।
ক্রিপ্টো প্রথম পর্বে মানুষখেকো গাছ নিয়ে লিখেছি। ওই কাহিনী কতটুকু সত্য, মানুষখেকো গাছ থাকা সম্ভব কিনা ওইটা অন্য কোথাও লিখবো। আজকে আমরা দেখবো আমাদের জানা, “প্রতিষ্ঠিত”, মাংশখেকো গাছগুলোকে।
একটা সুস্থ স্বাভাবিক, নরমাল মেন্টালিটির গাছ মাটি থেকে নাইট্রোজেন নিয়ে চলে, সাইকো টাইপের আচরণ করে না। কোন কোন জায়গায় মাটিতে নাইট্রোজেন থাকে না, তখন এরা বাচার তাগিদে পোকামাকড় ধরে খায়। তখন এদের নাম হয় কার্নিভোরাস প্ল্যান্ট।
২।
সবচেয়ে পরিচিত কার্নিভোরাস প্ল্যান্ট হোল পিচার প্ল্যান্ট, কলসি গাছ। পাতার পুরোটা অথবা পাতার সামনের অংশ কখনো কখনো চেঞ্জ হয়ে কলসির মতো হয় বলে এদের নাম কলসি গাছ। এই কলসিতে নিচে জমে থাকে হজম করার এনজাইম, কলসির ভেতরের দিকের রোমগুলো থাকে নিচের দিকে মুখ করে। নেক্টারের লোভ দেখিয়ে পোকামাকড়কে ডেকে আনে, একবার নিচে পরে গেলে আর উঠতে পারে না।

২০ সেমি. চওড়া, ৪১ সেমি. লম্বা নেপেন্থেসিস রাজা হোল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কলসি গাছ। বোর্নিওর ঘন জঙ্গলে এদের বাস। এর আড়াই লিটার ডাইজেস্টিভ ফ্লুয়িড পাখি ব্যাং এমনকি ইঁদুর পর্যন্ত হজম করে ফেলতে পারে। যদি কোনোদিন ২০০ সেমি লম্বা একটা কলসি গাছ পাওয়া যায় সেটা হবে মানুষখেকো গাছের বেস্ট ক্যান্ডিডেট।
এবার আমার এক্সপেরিয়েন্সের কথা বলি। ২ বছর আগে বৃক্ষমেলা থেকে কিনে এনেছিলাম ছোট, বড়, মিডিয়াম ৩ সাইজের ৩টা কলসি গাছ। বাসায় এনে ভালো করে খাওয়ানো দাওয়ানো হোল। সার দেওয়া হোল। ২ দিনের মাথায় মিনি কলসি শেষ :(. মিডিয়ামটা টিকল ১ সপ্তাহ। আর বড়টা সারটার পেয়ে কলসি বানানো বন্ধ করে দিলো। পাতার পর পাতা হয়, দেখে মনে হয় ঝাঁকরা ঝুঁকরা আগাছা পালতেসি। প্রমিজ করলাম, নেক্সট টাইম এই টাইপের গাছ আনলে খাবার দাবার সব বন্ধ। নেক্সট টাইমের গল্প নিচে আসবে।
৩।

সবচেয়ে সুন্দর কার্নিভোরাস প্ল্যান্ট হোল সান ডিউ কাছ, বাংলায় বলে সূর্যশিশির। সুসং দুর্গাপুরে নাকি এগুলো পাওয়া যায়, কোনোদিন গেলে খোঁজ করবো। এগুলো জন্মায় পানির ধারে। পুকুর থেকে যখন মশার বাচ্চা উঠে আশে, সানডিউর নেক্টারের লোভ সামলাতে পারে না। সানডিউর পাতায় পাতায় জুসি নেকটার, সূর্যের আলোয় সেগুলো শিশিরের মতো ঝলমল করে। মশা নেকটার খাওয়ার জন্য বসলে পা আটকে যায়। মশা একটু একটু করে নড়ে, সানডিউ একটু একটু করে রোল করে।
১৫ মিনিটের মধ্যে আঠায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে, নিঃশ্বাস নিতে না পেরে শিকার মারা যায়। শুরু হয় হজম করার পালা।
এই জিনিস অনেক খুঁজেছি, এখনও পাই নি দেশে।

৪।
চ্যাপ্টা ফুলের মতো অনেকগুলো মাখন লাগানো হলুদ পাতা, পাতার গায়ে ছোট ছোট গ্ল্যান্ড চিন্তা করলে বাটারওয়ার্ট গাছকে বোঝা যাবে। পাতার গায়ে লেগে আছে অনেকগুলো মরা মশা-মাছি।

ঝাঁঝি বা ব্ল্যাডারওয়ার্ট থাকে পানির নিচে। ব্ল্যাডারের মতো দেখতে ট্র্যাপ থাকে এদের, ট্র্যাপের পাশে থাকে একটা ট্রিগার। ব্যাঙ্গাচি ট্রিগারে টাচ করলেই ভাকিউয়াম ক্লিনারের মতো পানি সহ ব্যাঙ্গাচি ভিতরে ঢুকে যায়, তারপর ব্ল্যাডারের মুখ বন্ধ হয়ে যায় 🙁
৫।
ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপ হোল সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং কার্নিভোরাস গাছ। প্ল্যান্ট ভার্সেস জম্বির চম্পারের মতো এদের অনেকগুলো দাঁতওয়ালা পাতা হা হয়ে থাকে। পাতার গায়ে থাকে রসালো নেকটার। অনেকগুলো ছোট রোম ওয়েট করতে থাকে পোকার জন্য।
পোকা যদি পাতায় বসে কোন রকম রোম টাচ না করে নেকটার খেয়ে ফিরে যেতে পারে, ইটস ওকে, ভিনাস ওকে কিচ্ছু বলবে না। যদি একটা রোম টাচ করে ফেলে, টিক টিক করে একটা টাইমার চালু হয়। এর পরও পোকা উড়ে যেতে পারে, যদি না আরেকটা রোম টাচ করে।

পোকারা বোকা হয়, লোভী হয়। ভেতরে ঢুকে আরও নেক্টারের খোঁজে নড়াচড়া করে। সেকেন্ড রোম টাচ করে ফেলে। সেকেন্ড রোম টাচ করার পর সাথে সাথে পাতার দাঁত দুইটা বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় হজম করা। খুব পাওয়ারফুল পোকা হলে খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে, বাকিরা পারে না।
এক সপ্তাহ ধরে আস্তে আস্তে অ্যাসিড পরে আর পোকা হজম হয়। তারপর পরে থাকে পোকার শুকনা লাশ। তখন ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপ আবার ওপেন হয়, আরও পোকা চাই তার।
বছরে একবার ফুল ফোটানর সময় হয় ভিনাস গাছের। এই সময় পোকা মরলে চলবে না, পরাগায়ন করবে কে? ভিনাস তাই ফুল ফোটায় উঁচু শিশের আগায়, পাতার নাগাল থেকে বহু দুরে। সেই সময় ফ্রি ট্রিট পায় তার সার্ভেন্টরা।
ফুল ফোটানো শেষ, venus is back to business.
৬।
২ বছর আগে কলসি গাছের প্যাড়া টের পেয়ে ২য় টাইম বেলতলায়, সরি বৃক্ষমেলায় যেয়ে কিনে আনলাম ভিনাস গাছ। মেলার গাছগুলো তরতাজা না, খুবই দুর্বল, পোকা ধরলে পোকা পাতা ভেঙ্গে বের হয়ে যায়। এবার সার দেওয়া বন্ধ, পোকা ধরে দেওয়া শুরু হোল। ৭ -৮ টা পাতা, প্রতিদিন একটা না একটা পাতা হা করছে, পোকা চাচ্ছে। জ্যান্ত পোকা বের হয়ে যায়, পুরোপুরি মরা পোকা সে আবার খায় না, তার চাই ছটফট করা আধমরা পোকা।
এক মাস দুর্বল ভিনাস গাছের পেইন সহ্য করার পর আমার ভাইয়ের এক্সাম শুরু হয়, যত্ন আত্তিও কমে যায়। নেক্সট টাইম কিনলে, আরও টেকসই দেখে কিনবো।
শেষ ছবিটা আমার বাসার ভিনাস গাছের। পেটে একটা মাছি।
