কোয়ান্টাম ৪২: কোয়ান্টাম মাল্টিভার্স ৫



কোয়ান্টাম ৪২ 

কোয়ান্টাম মাল্টিভার্স ৫ 

অনেক জগত আর অনেক বিড়াল 

১। 

মাস খানেক আগে এই গল্পটা বলেছিলাম, আবার বলছি। 

একটা পর্দায় ইলেকট্রন আসবে। বক্কর ভাই জুলজুল চোখে পর্দার দিকে তাকিয়ে আছেন। 

পর্দায় দশটা জায়গা আছে। ইলেকট্রন এই দশ জায়গার যেকোনো এক জায়গায় আসবে। দশ জায়গার যেকোনো জায়গায় আসার সম্ভাবনা সমান। 

দশ জায়গায় দশটা সুইচ আছে। ইলেকট্রন কোন সুইচে আসবে, তার উপর নেক্সট কাজ শুরু হবে। 

এক নম্বর জায়গায় আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকে ঠাডা পড়বে। 

দুই নম্বর জায়গায় আসলে বিল গেটসের মাথায় বাজ পড়বে। 

তিন নম্বর জায়গায় আসলে জেফ বেজোসের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হবে।

কি হবে আসলে? 

বক্কর ভাই জানে না।  

বিল গেটস, জেফ বেজোস, কেউ জানে না। 

অসুবিধা নাই, আমরা অনেক কিছু নাও জানতে পারি। কিন্তু ইলেকট্রন নিজে তো জানে সে কোথায় আছে? কোন পথে আসবে। 

না। 

সিরিজের ৩৬, ৩৭ পর্বে প্রমাণ করেছি, ইলেকট্রন নিজেও জানে না সে কোথায় আছে। বেলের অসমতা ভঙ্গ হয়। 

https://nayeem.science/category/physics/quantum-mechanics/

আগে থেকে কিচ্ছু ঠিক করা নেই। 

এটা বলা ভুল যে ইলেকট্রন আসলে দুই নাম্বার ঘরের দিকে যাচ্ছে, বক্কর ভাই জাস্ট আগে থেকে জানতো না। 

বরং, বেলের অসমতা ভঙ্গ হওয়ার মানে, যে মুহূর্তে বক্কর ভাই ইলেকট্রনকে দেখবে, ঠিক সেই মুহূর্তে নির্ধারিত হয় ইলেকট্রন কোথায় থাকবে। 

তার আগ পর্যন্ত ইলেকট্রন দশ জায়গার সুপারপজিসন অবস্থায় আছে। 

২। 

ধরেন যে বক্কর ভাই দেখলেন আর ইলেকট্রনকে তিন নম্বর ঘরে পাওয়া গেলো। 

এক নম্বর নয় কেন? এক নম্বর ঘর কি দোষ করেছে? 

কেন দুই নম্বর না? চার নম্বর না? 

এটা কে ঠিক করবে ইলেকট্রন আসলে কোন ঘরে যাবে? 

কে ঠিক করবে বিল গেটস হ্যাক হবে নাকি জেফ বেজোস? 

দুইটা উত্তর আছে। আজকে শুধু দ্বিতীয়টা বলব। প্রথমটা চিন্তা করেন। 

৩। 

হিউ এভারেট তাঁর পি এইচ ডি থিসিস হিসাবে এই সামাধানটা প্রস্তাব করেন। এর নাম Many World Interpretation. কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে এটা একটা। 

খেয়াল করে শুনেন। 

যে মুহূর্তে বক্কর ভাই ইলেকট্রনকে দেখলেন সাথে সাথে ইউনিভার্স দশটা ভাগে ভাগ হলো। 

একটাতে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক হ্যাক হয়েছে। কিন্তু বিল গেটস, জেফ বেজোসের কিচ্ছু হয় নি। 

আরেকটাতে বিল গেটসের ফকির হয়েছে। সে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিতে। 

আরেকটাতে জেফ বেজোস শেষ। অ্যামাজন বক্কর ভাইয়ের পকেটে। 

৪। 

কোয়ান্টামের আশ্চর্য পৃথিবী র‍্যান্ডম। 

আমাদের শরীরের প্রতিটা অণু পরমাণু কোয়ান্টাম জগতের বাসিন্দা। 

মেনি ওয়ার্ল্ড ইন্টারপ্রিটেশান মতে, প্রতি মুহূর্তে, প্রতি মানুষের জন্য হাজার হাজার মহাবিশ্ব তৈরি হচ্ছে। 

আমার মায়ের শরীরে প্রথম যখন র‍্যান্ডম মিউটেশন হয়ে ক্যান্সার কোষ জন্ম হয়, কোন একটা মহাবিশ্বে সেটা হয়তো শুরুতেই ধ্বংস হয়ে গেছে। বেশিদূর যেতে পারে নি। 

এমন কোন পৃথিবী থাকতেও পারে যেখানে বিশ্বজিতের খুনিদের সবার ফাঁসি হয়ে গেছে। বিচারকের হয়তো শেষ মুহূর্তে ন্যায় বিচারের কথা মনে পরে। 

এমন কোন পৃথিবী থাকতেও পারে যেখানে শেষ মুহূর্তে, কোন প্রায় অসম্ভব ঘটনায় নুস্রাতের খুনিরা ঘটনার আগেই ট্রাকে চাপা পরে মারা গেছে! 

এমন ভয়ঙ্কর পৃথিবী থাকতেও পারে যেখানে ৭১ এ পাকিস্তান জিতে গেছে আর আমার এই লেখাটা আরবি অক্ষরে পালটে গেছে! 


এইবার বিড়ালের গল্পটা বলি। 

৫।  

আরভিং শ্রোডিঙ্গার কোনদিন মেনে নিতে পারেন নি কোয়ান্টাম জগত এতোটা উদ্ভট। তিনি একটা পরীক্ষার কথা বলেন। 

একটা বাক্সে একটা বিড়াল, একটা পটাশিয়াম সায়ানাইডের বোতল, একটা হাতুড়ি আর একটা রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ রাখা হবে। আর আছে একটা গাইগার মুলার কাউন্টার। 

রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ থেকে আলফা কণা বের হবে কিনা এটা র‍্যান্ডম। আগে থেকে কিচ্ছু ঠিক করা নাই। 

বেশিক্ষণ না, ধরেন মাত্র এক মিনিট ধরে পরীক্ষা চলবে। 

এক মিনিটের মধ্যে যদি আলফা কণা বের হয়ে আসে, তাহলে সেটা কাউন্টারে ধরা পড়বে। হাতুড়ি চলবে। বিষের বোতল ভাঙবে। বিড়াল মরবে। 

নাহলে বিড়াল বাঁচবে। 

এই সবকিছু ঠিক হবে কখন বলেন তো? আপনি বিড়ালকে দেখার পর। 

তার মানে, বিড়ালকে দেখার আগ পর্যন্ত, 

আলফা কণা বের হয়েছে আর হয় নাই এর সুপারপজিশনে আছে। 

বোতল ভেঙেছে আর ভাঙে নাইয়ের সুপারপজিশনে আছে। 

বিড়াল একই সাথে জীবিত আর মৃত আছে!! 

দেখার সাথে সাথে দুইটা দুনিয়া হবে। 

একটাতে বিড়াল বেঁচে আছে, আরেকটাতে সে মারা গেছে। 

অথবা, আরও ক্লিয়ার করলে, দেখার সাথে সাথে আপনি দুইটা দুনিয়া থেকে যেকোনো একটাকে বেছে নিবেন। আপনার প্যারালাল প্রতিবিম্ব বেছে নিবে আরেকটা। 


৭। 

একটা ছেলে প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে আছে। 

একটু পরে ট্রেইন ছাড়বে। 

সে কি বাবার সাথে যাবে না মায়ের সাথে? 

ট্রেইনে চড়বে নাকি ফিরে যাবে? 

যতক্ষণ সে সিদ্ধান্ত না নিচ্ছে, তার জন্য অপেক্ষা করছে অগণিত সম্ভাবনা! 

 (Mr Nobody) 

(চলবে)

গল্প শেষ। এবার কিছু পয়েন্ট।
১। কোয়ান্টাম মেনি ওয়ার্ল্ড প্রমাণিত নয়।
২। আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা, চেতনা, ব্রেইন এসবের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
৩। দেখা বলতে যেকোনো পরিমাপ। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলাও হতে পারে।
৪। পরিমাপের আগ পর্যন্ত একটা জিনিস সব অবস্থায় থাকে। মাপলে এক জায়গায় চলে আসে।
৫। কেন এই জায়গায় আসলো, অন্য কোথাও নয় এর একটা ব্যাখ্যা হলো অনেক জগত।

One thought on “কোয়ান্টাম ৪২: কোয়ান্টাম মাল্টিভার্স ৫”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *