হেড ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট
১।
আপনার মাথা কেটে আরেকজনের শরীরে বসিয়ে দেওয়াকে বলে হেড ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট।
আপনার কনশাস্নেস থাকে ব্রেইনে। ব্রেইন যেখানে থাকে আপনিও সেখানে থাকবেন। আপনার ব্রেইনটাকে কেটে একটা জারে রেখে যদি সেখানে অক্সিজেন দেও হয়, পুষ্টি দেওয়া হয়, আর সব সিগন্যাল ইনপুট দেওয়া হয় আপনি টের পাবেন না আপনি আসলে সত্যিকারের মানুষ নাকি জারের মধ্যে একটা ব্রেইন। ব্রেইন, কনশাসনেস এসব নিয়ে ৬ পর্বের সিরিজ লিখেছি, আজকের টপিক কনশাসনেস না।
আমরা কি আসলে জারের মধ্যে একটা ব্রেইন? কোন উন্নত প্রাণীর খেলনা? এক কথায় উত্তর, আমরা জানি না।
আমরা কি কোন মানুষ বা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ব্রেইন এভাবে জারে এনে তাকে বাইরে থেকে পুষ্টি দিয়ে, অক্সিজেন দিয়ে বাঁচাতে পেরেছি?
উত্তর হলো, না, এখনো পারি নি।
ব্রেইন বাদ দেই। আস্ত মাথা কেটে পুষ্টি দিয়ে, অক্সিজেন দিয়ে কি বাঁচিয়ে রাখা গেছে?
উত্তর হলো, হ্যাঁ।

২।
এই কাহিনীর শুরু আজকে না, ১০০ বছর আগে।
১৯০৮ সালে অ্যালেক্সিস ক্যারেল আর ক্লদ গুথ্রিয়ে একটা কুকুরের মাথা কেটে অন্য আরেকটা কুকুরের শরীরে জুড়ে দিয়ে রক্তাক্ত, রোমহর্ষক এক নতুন যুগের সূচনা করেনঃ হেড ট্র্যান্সপ্ল্যান্টএর যুগ। এই কুকুর কয়েক ঘণ্টা পর মারা যায়, মারা যাওয়ার আগে সামান্য রিফ্লেক্স অ্যাকশন দেখিয়েছিল।
৪০এর দশকে হলো আরেক ভয়ঙ্কর পরীক্ষা। একটা কুকুরের মাথা কেটে মাথাটাকে জোরা দেওয়া হলো একটা ব্লাড পাম্পের সাথে। শরীর ছাড়া কাটা মাথাটা বেঁচে থাকলও আরও কয়েক ঘণ্টা। মারা যাওয়ার এই কাটা মাথা বাইরের শব্দে রিয়াক্ট করলো, জিভের সামনে সাইট্রিক অ্যাসিড ধরলে সেটা জিহ্বা দিয়ে চাটল।

৫০ এর দশকে রাশিয়ার ভ্লাদিমির দেমিকভের এক্সপেরিমেন্টগুলো মারাত্মক। ইনি শিখেছিলেন কিভাবে কুকুরের মাথা কেটে অন্য জীবিত কুকুরের হার্টের সাথে কানেক্ট করে ব্লাড সাপ্লাই দিয়ে কুকুরকে অনেকক্ষণ বাঁচিয়ে রাখা যায়। এই এক্সপেরিমেন্টগুলো অনেকদূর সফল হয়েছিল। একটা জীবিত কুকুর, তার শরীরে ২টা মাথা। একটা তার নিজের, আরেকটা মাথা অন্য কুকুরের শরীর থেকে কেটে এনে লাগানো হয়েছে। কাটা মাথাটা নড়াচড়া করছে, চোখ এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, এমনকি খাওয়া দাওয়াও করছে। এই খাবারগুলো কোন পাকস্থলীতে যাচ্ছে না, নল দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে ।

ভ্লাদিমিরের কুকুরগুলো কয়েক দিন বাঁচত, সবচেয়ে বেশি রেকর্ড ২৯ দিনের। বাইরে থেকে আসা একটা মাথাকে শরীর গ্রহণ করতে চায় না, শরীরের ইমিউন সিস্টেম আস্তে আস্তে তাকে মেরে ফেলে। নার্ভাস সিস্টেম কানেক্ট করা হয় নি, এই শরীরের উপর তাই নতুন মাথাটার কোন কন্ট্রোল নেই। তবু এই মাথাটা বেঁচে ছিল, খাবার খেয়েছিল, মরার আগে কত কষ্ট পেয়েছে জানি না ।

এই এক্সপেরিমেন্ট অনেকবার হয়েছে। ইঁদুরের উপর, বানরের উপর। শুধু শরীরে ২টা মাথা না। মাথা কেটে ফেলে নতুন মাথারও পরীক্ষা হয়েছে।
১৯৫৪ থেকে ২০১৭। ৬৩ বছর। অনেক অনেক পরীক্ষা।
অবশেষে ২০১৭ সালে আসল সেই মাহেন্দ্রক্ষণঃ মানুষের হেড ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট, দি আল্টিমেট এক্সপেরিমেন্ট !
৩।
এক মৃত্যুপথযাত্রীর মাথা কেটে অন্য এক ব্রেইন ডেড রোগীর শরিরে বসানোর কথা । সাবজেক্টের নাম ভ্যালেরি স্প্রিন্ডোনভ, ভয়ঙ্কর ওয়েরডিং হফম্যান ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে তিলে তিলে মরছেন।
ডাক্তারের নামটা মনে রাখেন, ডক্টর ক্যানাভেরো। এ পর্যন্ত অনেকবার হেড ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করেছেন, ইঁদুরর উপর। এবার করবেন মানুষের উপর।
ভ্যালেরির মাথাটাকে প্রথমে ১০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা করা হবে। তারপর খুব সাবধানে ঘারের শিরাধমনীগুলোকে কাটা হবে। স্পাইনাল কর্ডটাকে কাটতে হবে খুবই খুবই সাবধানে, মারাত্মক চোখা একটা ডায়মন্ডের চাকু ইউজ হবে এজন্য। কাটা শেষ হলে মাথাটাকে একটা ক্রেনে ঝুলিয়ে মাথা থেকে সব রক্ত বের করে দেওয়া হবে, যাতে করে কোন জমাটবাধা রক্ত না থাকে। এই কাজটা করতে হবে খুব দ্রুত, নিউরনগুলো যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়।

ডোনারের মাথা কাটা শরীরটা রেডি হয়ে আছে, ভ্যালেরির কাটা মাথাটা খুব দ্রুত সেখানে লাগানো হবে। রক্তনালীগুলো জোড়া লাগানো হবে সেলাই করে। স্পাইনাল কর্ড জোড়া লাগানোর জন্মও ব্যাবহার হব্যে এক ধরনের আঠা টাইপের কেমিক্যাল। জোড়া লাগানো হবে মাংস আর চামড়া। তারপর ভ্যালেরিকে ৩ দিনের জন্য কোমায় পাঠানো হবে। ৮০ জন ডাক্তার ৩ দিন ধরে এই অপারেশন করবেন, খরচ লাগবে ১০ মিলিয়ন ইউরোর মতো।
সাফল্যের সম্ভাবনা কম। ভ্যালেরির শরীরের উপর কন্ট্রোল ফিরে পাবার সম্ভাবনা খুবই কম, এখন পর্যন্ত একটাও পুরোপুরি সফল স্পাইনাল কর্ড ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট হয় নি। ভ্যালেরির ভয়াবহ কষ্ট পেয়ে মারা যাওয়া, পরে পাগল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক। পুরো শরীর প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া খুবই সম্ভব।
একদিকে নিশ্চিত মৃত্যু, আরেকদিকে হেড ট্র্যান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে নতুন জীবনের সম্ভাবনা, যে জীবন হতে পারে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। আপনি হলে কি করতেন?
৪।
ভ্যালেরি শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে আসেন। ওই অপারেশন হয় নি। হয়তো সামনে হবে, অন্য কারও উপর।
Krr Tanvir
ওহ, হয়নি তাহলে!
অনেকদিন আগে এই অপারেশনের কথাটা শুনেছিলাম। কিন্তু সেই অপারেশন হয়েছিল কিনা সেটা জানতাম না!
Horrid Udoy
ভাই এই টপিক নিয়ে আরেকটা পর্ব লিখেন।
খুব মজা পেয়েছি😋😋
Nayeem
Mrittu niye lekhar plan ache 🙂
Muzaffur hossain
Nice
Hridoy Hoque
I used to scream over my head for being nothing but filled with junky stuffs.
Finally, I read this article.
So now, I’m in love with my head. 😐
Nayeem
😀