চতুর্থ পর্বঃ মাইন্ড রিডিং এর গল্প





“Of course it is happening inside your head, Harry, but why on earth should that mean that it is not real?” -Albus Dumbledore

১।
ক্ল্যাশ রয়াল গেমটা আমার কাছে অনেকটা নেশার মত। এই নেশাটা আমার জন্য ক্ষতিকর, স্টিল পুরোপুরি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না। একদিন কিছুটা ট্রফি বাড়লে নিজেকে বুঝ দেই, আজকে এই পর্যন্তই, পরে আবার খেলা যাবে। একদিন যেতে না যেতেই আবার অস্থির হয়ে উঠি, অনেকক্ষণ তো হোল, আর কত!

সিরিয়াল  কিলারদের কাছে খুন করা এক ধরনের নেশা। একটা খুন করার পর তারা সাময়িকভাবে শান্তি পান। মনে হয় একটা বোঝা নেমে গেছে বুকের উপর থেকে। একটা খুনের পর কিছুদিন কুল ডাউন পিরিয়ড চলে। তারপর আবার অস্বস্তি বারতে থাকে। বারতে বারতে এমন অবস্থা হয় আরেকটা খুন না করা পর্যন্ত তারা থাকতে পারেন না।

এইযে তারা একের পর এক খুন করেন, এর কতটুকু নিজের ইচ্ছায় করেন? খুন কি আসলে কনশাস ডিসিশন? তারা কি নিজের ইচ্ছায় খুন করেন নাকি ব্রেইনের কোন একটা পার্ট থেকে খুন করার ডিসিশনটা এসে কর্টেক্সের অনুভুতিকেন্দ্রে শান্তির অনুভূতি পৌঁছে যায়?

আমরা কি আসলে কোন কিছুর ডিসিশন নেই নাকি ডিসিশন আসলে আনকনশাস প্রসেস, নেয়া হয়ে যাওয়ার পর আমাদের বুঝ দেওয়া হয় ডিসিশনটা নিজের ইচ্ছায় নেওয়া?

ফ্রি উইল, অনেক বড় একটা রহস্য। সামনে আলোচনা হবে আরও।

২।
প্লানেরিয়ানের গল্প মনে আছে?  ঐযে ক্রিমি জাতীয় প্রাণী, যাদের ২ ভাগ করে ফেললে ২টা আলাদা প্রাণী হয়ে যায়? মনে না থাকলে প্রথম পর্ব পরে আসতে হবে।

প্রশ্ন করেছিলাম, আপনাকে যদি লম্বালম্বিভাবে ২ টুকরো করা হয়, তারপরও আপনি বেচে থাকেন, কোন পার্টটা আপনি হবেন, ডানেরটা না বামেরটা?

৫৫ বছর বয়সী ক্যারেন বায়ার্ন এরকম ২ টুকরো একজন মানুষ। তার মাথার ভেতর ২টা স্বত্বা বাস করে। এলিয়েন ব্রেইন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত এই মহিলার বাম হাত আর বাম পায়ের নিজস্ব স্বত্বা আছে। তিনি যখন ডান হাতে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করেন মাঝে মাঝে বাম হাত আগ বাড়িয়ে সেটাকে নিভিয়ে দেয়। তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে এটা ওটা জিনিস সরানোর চেষ্টা করে। একবার ডাক্তারের সামনে তাকে একটা লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, তার বাম হাত একা একা তার জামার বোতাম খোলা শুরু করে।

এই মহিলা কর্টেক্স ২ টুকরা,  ভয়ঙ্কর মৃগী রোগের চিকিৎসা হিসাবে ২ হেমিস্ফিয়ারের সংযোজক করপাস কলোসামকে  কেটে দেওয়া হয়েছে। তিনি এখন তিনি নন, তাঁরা। কিন্তু কেন ‘তিনি’ দাবী করেন তাঁর বাম হাত কথা শুনে না? কেন, তিনি তাঁর ডান পাশ আর বাম পাশ অন্য কেউ?

কারন হোল, আমাদের ভাষা কন্ট্রোল করে বাম ব্রেইন, আর বেশিরভাগ মানুষের  বাম ব্রেইন ডান ব্রেইনের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়। বাম ব্রেইন কন্ট্রোল করে ডান সাইডকে, তাই ক্যারেন যখন কথা বলেন, তিনি নিজেকে দাবী করেন ডান পাশ হিসাবে।

ক্যারেনের ব্রেইন ২ টুকরো, এই ২ টুকরোই আলাদাভাবে কনশাস। আরও কত টুকরো করা যাবে ব্রেইনকে? কতক্ষণ পর্যন্ত কনশাসনেস থাকবে? ২ টুকরো কি আস্ত ব্রেইনের সমান কনশাস নাকি কনশাসনেস কিছুটা কমেছে? যদি আরও ১০-১২টা টুকরো করি? একজন দেখবে, আরেকজন শুনবে, আরেকজন ভালোবাসবে? যে দেখে তাকে যদি আরও টুকরো করতে থাকি? একজন রঙ দেখে, একজন শেপ, আরেকজন স্পিড? তারপর একজন লাল রঙ দেখে, আরেকজন নীল রঙ?

আমরা আগামী পর্বে এই ব্যাপারে আরও ডিপে ঢুকব, কর্টেক্সকে কুচি কুচি করে কনশাসনেস খোজার চেষ্টা করবো। তার আগে আমাদের আরও ক্লিয়ার হতে হবে কনশাসনেস থাকে কর্টেক্সে, অন্য অংশে নয়।

৩।
সায়রা সায়েন্টিস্টের কথা মনে আছে? সেই যে জাফর ইকবালের গল্পের মহিলা বিজ্ঞানী, যে কিনা হেলমেটের মত দেখতে একটা যন্ত্র বানিয়েছিল, যেটা দিয়ে ব্রেইনের বিভিন্ন জায়গায় স্টিমুলেশান দেওয়া যায়? কোন এক জায়গায় স্টিমুলেশান দেওয়া হলে আপনি চোখের সামনে ভুত দেখবেন, আরেক জায়গায় দেওয়া হলে নিজেকে মনে হবে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি, আরেক জায়গায় দিলে মনে হবে পান্তা ভাত দিয়ে পিজ্জা খাচ্ছেন?

এই জিনিস করা যায়, করে করে মোটামুটি ম্যাপ করা যায় ব্রেইনের কোন অংশ কোন অনুভূতি নিয়ে কাজ করে। উল্টো টা কি করা যায়? লাল দেখার জায়গাটা উত্তেজিত হলে আমি বলে দিতে পারব আপনি লাল দেখছেন, তিন কোনা দেখার জায়গাটা উত্তেজিত হলে আমি বলে দিতে পারব আপনি হয়তো রক্তমাখা ছুরির কথা ভাবছেন?

মাইন্ড রিডিংএর কত দেরি পাঞ্জেরী?

কই দেরি, মাইন্ড রিডিং অনেকদূর গেছে এখন। সিম্পল শব্দ, ডান বাম এইসব অনেক আগেই ডিকোড হয়ে গেছে, মাইন্ড কন্ট্রোল্ড রোবট মাত্র ১০০০০ রুপিতে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন আরও কমপ্লেক্স সেন্টেন্স ডিকোড করার। ছবি ডিকোডিং এর কাজ এগিয়েছে অনেকদূর। কমপ্লেক্স ছবি হয়তো এখনও অনেক বাকি, কিন্তু আপনি তিনকোণা না চারকোনা ভাবছেন ডিপ লার্নিং ব্যাবহার করে বলে দেওয়া যায়।



এই ডিকোডিং মোটামুটি ক্লিয়ারলি পয়েন্ট করে কর্টেক্সকে। গত পর্বের রহস্য এখনও থেকে যাচ্ছে, কি এই কর্টেক্স? কেন এতে এতো কিছু?

ধরলাম আমরা একদিন পুরপুরি ডিকোড করতে পারবো ব্রেইনের ভাষা। ধরলাম আমরা জানবো ব্রেইনের কাছে AAA মানে তিনকোণা, AAB মানে চারকোনা। কিন্তু আমরা কি বলতে পারবো নিউরনে যখন AAA প্যাটার্ন দেখা যায় তখন কেন আমরা তিনকোনা দেখি? কেনই বা কিছু একটা এক্সপেরিয়েন্স করি?



বিস্তারিত, আগামী পর্বে।


আপনি মনে মনে কোন ছবিটা ভাবছেন নিউরাল নেটয়ার্ক ব্যবহার করে অনেকখানি ডিকোড করা যায়।

3 thoughts on “চতুর্থ পর্বঃ মাইন্ড রিডিং এর গল্প”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *