কোয়ান্টাম ২: E = hf

কোয়ান্টাম ২
E = hf

একটা জায়গার পরিধি অসীম, কিন্তু ক্ষেত্রফল সসীম। কিভাবে সম্ভব?

যদি y = 1/2^x, x>=0 এর গ্রাফ আঁকি, তাহলে দৈর্ঘ্য অসীম হয় কিন্তু গ্রাফের নিচের জায়গাটুকুর ক্ষেত্রফল সসীম হয়।
1 + 1/2 + 1/4 + …. = মাত্র 2
কিন্তু রেখাটা চলতেই থাকবে।
অল্প একটু রঙ নিয়ে ভেতরের জায়গাটুকু ফিল আপ করে ফেলা যাবে, কিন্তু অসীম রঙ লাগবে রেখাটা টানতে।
কিভাবে সম্ভব?
শুরু করছি, কোয়ান্টাম ২।

১।

১৯০০ সাল।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ভাবছেন। তাঁর সামনে উপস্থিত অদ্ভুত এক সমস্যা।

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশানের হিসাব মিলছে না।

র‍্যালে জিনসের সমীকরণ বলছে যত বড় ফ্রিকোয়েন্সি তত বেশি শক্তি। ফ্রিকোয়েন্সির তো লিমিট নাই, আর ব্ল্যাক বডি সব রকম ফ্রিকোয়েন্সিতে বিকিরণ করে। ব্ল্যাক বডির শক্তি তো বাড়তে বাড়তে অসীম হয়ে যাওয়ার কথা।

ব্ল্যাক বডি এমন কোন ম্যাজিক্যাল জিনিস না। একটা গোল জিনিস, একপাশে ছোট একটা ফুটা, ওই ফুটা দিয়ে আলো ঢুকলে ওইটা বের হওয়ার চান্স খুব কম, ধাক্কা খেয়ে ভিতরে ঘুরতে থাকবে, এই হোল মোটামুটি ব্ল্যাক বডি। ছোট ছিদ্র দিয়ে আলো ঢুকে, ওই আলো শোষণ করে ব্ল্যাক বডির দেওয়াল গরম হয়, তারপর দেয়াল দিয়ে ওই শক্তি বিকিরণ হয়।

অসীম শক্তি হওয়া সম্ভব না। র‍্যালে জিনসের সমীকরনের সাথে পরীক্ষার ফলও মিলছে না। প্ল্যাঙ্ক চুল ছিঁড়ছেন। ওই সমীকরণে নিশ্চয়ই সমস্যা আছে, কি সমস্যা ধরতে পারছেন না।

ওই সময়, বোল্টজম্যানের পেপার ঘাটতে ঘাটতে প্ল্যাঙ্কের মাথায় ২টা লাইট বাল্ব জ্বলল। প্রথমটা, উপরের প্যারাডক্সটার সমাধান। আগে ওইটা দেখে আসি।

২।
1 + 1/2 + 1/4 + 1/8 + … = 2
এটার ক্ষেত্রফল সসীম কেন?
কারন, এই জিনিস আঁকতে হলে,
x=0 এর জন্য বসান লাগবে, ধরি ৬৪টা অণু
x=1 এর জন্য? ৩২টা
এরপর?
১৬টা
৮টা,
শেষ পর্যন্ত একটা।
তারপর কিন্তু অর্ধেকটা অণু বসাতে হবে।
দৈর্ঘ্য বরাবর কিন্তু সব সময়ই মিনিমাম ১টা অণু হিসাব করা হচ্ছে।
ক্ষেত্রফল বরাবর অর্ধেক্টা, দৈর্ঘ্য বরাবর অর্ধেকটা, কোন কথা হোল? দৈর্ঘ্য তো ক্ষেত্রফলের অংশ।
তার মানে, ক্ষেত্রফল অর্ধেক অণু ডিমান্ড করার সাথে সাথে আসলে এই সিরিজ শেষ।
প্ল্যাঙ্কের প্রথম লাইট বাল্বঃ শক্তিও অণু দিয়ে তৈরি।
দ্বিতীয় লাইট বাল্বঃ বেশি শক্তিতে বড় অণু তৈরি হয়। বোল্টজম্যানের মতে, এই বড় অণু তৈরি হওয়া কঠিন।
অর্ধেক্টা অণু তো আর হতে পারে না।

শক্তির এই অণুর নাম দেওয়া হোল কোয়ান্টা। একটা কোয়ান্টার শক্তি E=hf. f এখানে কম্পাঙ্ক, h প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক। f বাড়লে বড় কোয়ান্টা তৈরি হবে। বড় কোয়ান্টা তৈরি হওয়া কঠিন। অর্ধেকটা কোয়ান্টা তো আর হতে পারে না। তাই, খুব হাই ফ্রিকোয়েন্সিতে মোট শক্তি, অর্থাৎ E = hf গুলোর যোগফল সসীম থাকবে।

প্রশ্ন হোল, E = hf আসলে মানে কি? কিভাবে E = hf হয়?

৩ ।
৫ বছর পরের কথা। সুইজারল্যান্ডের প্যাটেন্ট অফিসের এক কেরানি, কাজের ফাঁকে ফাঁকে অকাজের জিনিস নিয়ে চিন্তা করা তার স্বভাব। ২৫ বছর বয়স তার। আজকে সে ভাবছে ফটো ইলেক্ট্রিক ইফেক্ট নিয়ে।

আলোর ওয়েভ তত্ত্ব নিয়ে একটা ঝামেলা হচ্ছে। পানির ক্ষেত্রে, আমরা জানি যত বড় ডেউ তার তত শক্তি। ছোট ঢেউ ধাক্কা দিয়ে ছোট বাচ্চাকে ফেলবে। বড় ঢেউ আমাকে ফেলবে। আরও বড় ঢেউ হাল্ককে ফেলবে।

এই জিনিস আলোর ক্ষেত্রে খাটছে না। বড় ঢেউ হাল্ককে ফেলতে পারছে না। যত বড় ঢেউ, তত বেশি মানুষ পড়ছে। হাল্ককে ফেলতে লাগছে আসলে সেকেন্ডে অনেকগুলো ছোট ছোট ঢেউ।

ফটোইলেক্ট্রিক ইফেক্ট মানে, আলো ধাক্কা দিবে, ইলেকট্রন বের হয়ে আসবে। বেশি বিস্তারের আলো ধাক্কা দিলে সবচেয়ে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা ইলেকট্রনগুলোও সুড়সুড় করে বের হয়ে আসবে। আসলে সেটা হোল না। দেখা গেল, শক্তভাবে পরমাণু আঁকড়ে ধরে বসে থাকা ইলেকট্রনগুলোকে বের করতে হলে অনেকগুলো ঢেউ দিতে হয়। ছোট বড় ব্যাপার না, সংখ্যা বেশি হতে হবে।

এই প্যাটেন্ট অফিসের কেরানি অঙ্ক ভালো পারত না, কিন্তু তার ছিল আউট অভ দ্যা বক্স চিন্তা করার অদ্ভুত ক্ষমতা। সে পুরনো কাগজ ঘেঁটে বের করে আনল প্ল্যাঙ্কের E=hf. ব্যাখ্যা করলো ফটো ইলেকট্রিক ইফেক্ট।

এর প্যাটেন্ট অফিসের কেরানির নাম আইনস্টাইন। এটা তার জীবনের সবচেয়ে ছোট কাজ, আর এই কাজটার জন্য সে কয়েক বছর পর নোবেল পায়। বড় বড় কাজগুলো মানুষ বুঝতে শিখেছে অনেক পরে।

এবার চলুন দেখে আসি E=hf কিভাবে চিন্তা করা যায়।

৪।
একটা কাল্পনিক ছবি আঁকি। ফোটনের সত্যিকার কাহিনী আরও জটিল, সেগুলোতে অনেক পরে আসবো। একটা ছবি মাথায় না থাকলে চিন্তা কঠিন। নিচের গল্পটা পড়েন, ভাবতে সুবিধা হবে। তবে, ছবিটাকে খুব বেশি সিরিয়াসলি নিলে ভুল করবেন।

“আলোর ক্ষেত্রে, ধরে নেন, ঢেউয়ের আগায় নৌকাও আছে। পাইরেট শিপ। শিপে একটা কামান আছে, ওই কামানে ছোট বড় গোলা ভরা যায়।
আধানের উঠানামাটাকে মনে করেন লিফটের মত। আপনি হচ্ছেন আধান। আপনি লিফটে করে যখন একেটা ফ্লোর পার করবেন, ১০০ গ্রাম লোহার গুঁড়া পাবেন। ওই গুড়াগুলো গলিয়ে গোলা বানাবেন। তবে গোলায় রঙ মেশানো আছে, এক ফ্লোরের গুড়া অন্যও ফ্লোরের গোলায় মেশাতে পারবেন না।
তো আপনি ১০ তলা বিল্ডিং উঠলেন। ১০ রঙের ১০টা গোলা হল আপনার। প্রতিটা ১০০ গ্রাম করে।
এবার নামলেন। আবার প্রতি ফ্লোরে আপনাকে ১০০ গ্রাম করে পাউডার দিবে। এখন আর আপনি গোলার সংখ্যা বাড়াবেন না। জাস্ট পাউডার যোগ করে গোলা মোটা করবেন।
৫ বার উঠলে আর নামলে কি হবে বলেন তো? আপনার হাতে থাকবে ১০০ * ৫ * ২ = ১০০০ গ্রাম ওজনের ১০টা গোলা।
এই গোলাগুলো এরপর পাইরেট শিপের কামানে ঢুকিয়ে ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিতে হবে। ১০টা ১ কেজির গোলা, ১০জন মোটা মানুষকে মারতে পারবে, তবে টাইটানিক ডুবাতে হলে হয়ত আরও অনেকবার উঠানামা করতে হত। ”

একটু ভাবলেই বুঝবেন, আসলে শিপ বা কামান কোনটাই দরকার নেই। দরকার শুধু গোলাগুলো। আলোর কোয়ান্টা ওই গোলাগুলোর নাম ফোটন। বড় ফোটন বেশি শক্তিশালী ইলেকট্রনকে ফেলে। তবে সেটা তৈরি করা কঠিন।

৫।
ফোটনের গোলা কি রিয়েল? সলিড বল? ঢেউয়ের সাথে সাথে চলে?
ঢেউ তো সবদিকে ছড়ায়। ফোটন তো লিমিটেড।
১০টা ফোটন থাকলে, ঢেউ তো মাঝখান থেকে সবদিকে ছড়াবে। ১০টা ফোটনের কোনটা কোনদিকে যাবে?
১টা ফোটন থাকলে কি সে উত্তর দিকে যাবে? দক্ষিণে নয় কেন? ঢেউ কি দক্ষিণে যায় না?
গোলা তৈরি আসলে কি জিনিস? কিভাবে বানায় এগুলো?
ফোটনের ঢেউ থাকলে, ইলেকট্রনের কি নাই? আপনার কি ঢেউ আছে?

(চলবে)

Nayeem Hossain Faruque

3 thoughts on “কোয়ান্টাম ২: E = hf

  1. 2 নম্বরের শুরুতে(এই ভাগে) 32, 16,8 এর ব্যাপারটা আর একটু ভালো করে যদি বুঝিয়ে বলেন।

    1. এভাবে ভাঙতে ভাঙতে একসময় একটা অণুতে যেয়ে ঠেকবে। তারপর আরও ভাঙ্গা যাবে না। হয় একটা অথবা শুন্যটা অণু হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

কোয়ান্টাম ৩: ফাউন্ডিং ফাদারস

Fri Jun 28 , 2019
Post Views: 1,245 Facebook0Tweet0Pin0 কোয়ান্টাম ৩ ফাউন্ডিং ফাদারস ১। পরীক্ষায় প্রশ্ন আসলো, ব্যারোমিটারের সাহায্যে বিল্ডিং এর উচ্চতা মাপতে হবে। ঘারতেরা ছাত্রের উত্তর, ব্যারোমিটারটাকে সুতায় বেঁধে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক, তারপর সুতা আর ব্যারোমিটারের দৈর্ঘ্য মাপলেই বের হয়ে আসবে বিল্ডিঙের দৈর্ঘ্য। এই উত্তর দেখে টিচারের মেজাজ মারাত্মক খারাপ হয়ে গেল। […]

Subscribe