গভীর সমুদ্রে ২

গভীর সমুদ্রে – ২

“ফসফরাসর সবুজ আলো মিলিয়ে গেছে এখন, চোখগুলোকে লাগছে এখন কালো দুটো গর্তের মতো, যেন যেকোনো মুহূর্তে ভেতর থেকে বেরইয়ে আসবে আতঙ্ককর কিছু। তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেদের দিকে। স্থির ওই চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেদের বড় ক্ষুদ্র আর অসহায় মনে হলো তিন গোয়েন্দার।

প্রশান্ত মহাসাগরের দুঃস্বপ্ন… বিড়বিড় করল কিশোর – একেবারে মানানসই নাম। ”

– তিন গোয়েন্দা, অথই সাগর -২

১।

এগারো ইঞ্চি চওড়া, ফুটবলের সমান একেকটা চোখ।  প্রাণিজগতের সবচেয়ে পার্ফেক্ট চোখগুলোর মধ্যে একটা, বিড়ালের চেয়ে তীক্ষ্ণ। আমরা ডাইনোসরের কথা জানি, বিশাল নীল তিমির কথা জানি, কিন্তু এত বড় সাইজের চোখ আর কারো নেই।

গভীর সমুদ্রে নিকষ কালো অন্ধকার। সেই অন্ধকারে বিশাল বিশাল চোখ মেলে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে কলোসাল স্কুইড, নজর রাখে স্পার্ম তিমির দিকে। শুধু চোখ না, সবকিছুই তার বড়। এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় কলোসাল স্কুইডের সাইজ ৪৩ ফুটের মতো, ওজন ৫০০ কেজি। কলোসাল স্কুইডের ভাই জায়ান্ট স্কুইড, আরেক্টু লম্বা, ওজন একটু কম। একটা বাসের চেয়ে লম্বা।

স্কুইডের ১০টা পা, ৮টা নরমাল সাইজ, ২টা বেশি লম্বা। পা না বলে শুর বা টেন্টাকেল বলা ভালো। স্কুইডের এই টেন্টাকেল্গুলোতে থাকে অসংখ্য সাকশন কাপ, শিকারকে শক্ত করে চেপে ধরার জন্য। জায়ান্ট স্কুইডের এই সাকশন কাপগুলোতে থেকে অনেকগুলো ছোট ছোট দাঁত, আর কলোসাল স্কুইডেরগুলোতে থাকে তীক্ষ্ণ হুক। প্রতি ইঞ্চি জায়গায় ১০০ পাউন্ড চাপ বসাতে পারে কলোসাল স্কুইড ওই হুকগুলো দিয়ে, মানুষের শরীর ছিঁড়ে ফালাফালা করে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

কলোসাল স্কুইড খুবই খুবই রেয়ার, মাত্র ২৫ বার কলোসাল স্কুইডের দেখা পাওয়ার রেকর্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। এরা থাকে সমুদ্রের অনেক গভীরে, অন্ধকারের রাজ্যে, আমাদের চেনাজানা জগত থেকে অনেক দুরে। এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় যে স্কুইডটা পাওয়া গেছে, তার চেয়ে অনেক বড় স্কুইডের চোয়াল পাওয়া গেছে স্পার্ম তিমির পেটের ভেতর। পাওয়া গেছে অনেক বড় সাকশন কাপের দাগ।

২।

৪০ ফুট লম্বা একটা স্কুইড অনায়াসে একটা মানুষ মারতে পারবে। একটা আস্ত জাহাজ ডুবাতে হলে দরকার আরও বিশাল, আরও ভয়ঙ্কর স্কুইডের।

দরকার হলো ক্র্যাকেনের। অডিসির স্কাইলার। কয়েকশ ফুট লম্বা মহাদানবের।

এদের গল্প কিন্তু চলে আসছে সেই আদ্যিকাল থেকে। এরিস্টটল বলে গেছেন বিশাল স্কুইডের কাহিনী। বলে গেছেন প্লিনি। এদের কথা উঠে এসেছে নরওয়েজিয়ান মিথে,

মধ্যযুগের বাস্ক আর পর্তুগিজ নাবিকরা বারবার বলেছেন সুবিশাল স্কুইডের গল্প। এমনকি ক্যারোলাস লিনিয়াস পর্জন্ত তার বই সিস্টেমা ন্যাচারিতে ক্র্যাকেনের বৈজ্ঞানিক নাম দিয়ে গেছেন Microcosmus marinus!

নিচে একটা গল্প বলব, এই গল্পের সত্যি মিথ্যা নিশ্চিত নয়। তবু বলব।

৩।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ভয়ঙ্কর উত্তাল সময়, উত্তাল সমুদ্র। ভারত মহাসাগরের মালদ্বীপের কাছাকাছি ঘুরছে একটা  ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটি ট্রলার।

রাতের সাগর। রহস্যময়, ভয়ঙ্কর। ঢেউয়ের আগায় ফসফরাস ভাসে, দুরে নড়াচড়া করে অদ্ভুত কিছু একটা, আশেপাশে ওঁত পেতে আছে শত্রুজাহাজ।

এ. জি. স্টার্কি একটু আগে একা মাছ ধরছিল, এখন আর ধরছে না। দুইটা সুবিশাল সবুজ চোখ তাকে সম্মোহিত করেছে, সে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে চোখদুটোর দিকে।

স্টার্কির ভাষায়ঃ

“As I gazed, fascinated, a circle of green light glowed in my area of illumination. This green unwinking orb I suddenly realized was an eye. The surface of the water undulated with some strange disturbance. Gradually I realized that I was gazing at almost point-black range at a huge squid.”

স্টার্কি সম্মোহন থেকে মুক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো । আশ্চর্য পরানিটাকে মাপল । তার জাহাজটা ১৭৫ ফুট লম্বা। এই স্কুইডের মাথা আর শুরের আগার মধ্যে দূরত্ব ১৭৫ ফুটের বেশি।

একটা ১৭৫ ফুট লম্বা স্কুইড মানে নীলতিমির দ্বিগুণ। এত বড় স্কুইড হওয়া সম্ভব কিনা আমরা জানি না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকতে থাকতে এ. জি. স্টার্কি ঠিক কি দেখেছিলো বলতে পারছি না।

৪।

রোমান প্রকৃতিবিদ প্লিনি ছিলেন খুবই কল্পনাপ্রবণ একজন মানুষ। তাঁর ন্যাচারাল হিষ্ট্রি বইয়ে উঠে এসেছে কুকুর মাথা মানুষের কথা, এক পাওয়ালা দানবের কথা। এই দানবগুলো প্লিনির কাছে ছিল সত্যিকারের। এই প্লিনিই সমুদ্রের কাছে এসে লিস্ট তৈরি করলেন ১৭৬টা প্রাণীর, তারপর হারকিউলিসের নামে শপথ করে বললেন, সমুদ্র নিয়ে যা জানার জানা হয়ে গেছে, আর কিচ্ছু জানার বাকি নেই!

অল্প বিস্ময় মানুষকে কৌতূহলী করে। মানুষ হাঁটি হাঁটি পা পা করে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করে দরজার ওপাশে আসলে কি আসে।

প্রবল বিস্ময় সামনে টেনে ধরে গারো অন্ধকারের পর্দা। কেউ কেউ বলে, ওই পর্দার ওপাশে বাস করে দৈত্য দানোরা। কেউ নিজেকেই প্রবোধ দেয়, ওপাড়ে কিচ্ছু নেই, অনেক দেখা হয়েছে, চলো বাড়ি যাই। গারো অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে উঁকি মারার সাহস সবার হয় না। আজকে আমরা সেই সাহস করবো। ম্যারিয়ানা ট্রেঞ্চের প্রথম অভিযাত্রী উইলিয়াম বিবের মতো তিনফুট চওড়া একটা ব্যাথিস্ফিয়ারে করে ডুব দিবো গভীর সমুদ্রের তলায়।

দেখে আসবো, কি আছে ওই কালো পানির অতলে।

Below the thunders of the upper deep;

Far far beneath in the abysmal sea,

His ancient, dreamless, uninvaded sleep

The Kraken sleepeth: faintest sunlights flee …

আলফ্রেড টেনিসন, ১৮৩০

(চলবে)

Nayeem Hossain Faruque

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

গভীর সমুদ্রে ৩

Thu Jun 27 , 2019
Post Views: 791 Facebook0Tweet0Pin0 গভীর সমুদ্রে – ৩ ১। ট্রিড্যাকনা জাইগাস হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঝিনুকের নাম । সমুদ্রের ৫০-৬০ ফুট গভীরে, আলোর রাজ্যে এদের বাস। এদের সাড়ে চারফুট লম্বা বিশাল শরীরটা হাঁটাচলা করতে পারে না। ছোটবেলায় নড়ে চড়ে বেড়ায়, বড় হয়ে গাছের মতো শিকড় গাড়ে প্রবালের ফাঁকে। একেকটার বয়স […]

Subscribe